Monday, 7 May 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯






কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের মত মনে হবে। তবু যাঁরা সমতলের মানুষ আর আমার আগের লেখাগুলো পড়েননি, তাঁদের জন্য থাক। এদের বলে ক্রীপারস, মানে যারা কিছুর গা বেয়ে বেয়ে ওঠে। পাখিদের মধ্যে দু ধরণের ক্রীপার আছে, ট্রী ক্রীপার আর ওয়ল ক্রীপার। ওয়ল ক্রীপার উঁচু পাঁচিলের গা বেয়ে ওঠে। পাহাড়ের পাখি, পাথর বেয়েই ওঠে তবে দূর্গ জাতীয় মজবুত দেওয়াল পেলেও ওঠে। এদিকে ট্রী ক্রীপাররা গাছ বেয়ে বেয়ে ওঠে। এরা গাছের বাকলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পোকামাকড় খায়। পাখিদের মধ্যে কী অসাধারণ বৈচিত্র প্রকৃতির সব রকম খাদ্যভাণ্ডার থেকে তারা আলাদা আলাদা রকম ভাবে প্রোটীন সংগ্রহ করে। এক জায়গায় বেশি প্রতিযোগিতা যাতে না হয়। কিন্তু সেই চিরাচরিত কথা আবার বলতে হয়। মানুষ এই বৈচিত্র রাখতে দেবেনা। সব পাখি যে গভীর জঙ্গলে থাকেনা, নানারকম গাছ, ঝোপঝাড়, ঘাস, কতকিছুর ওপর যে তারা নির্ভর, কে বোঝাবে, কাকেই বা বোঝাবে। রাহস্থানের একটি মাত্র জায়গায় এখন ‘স্পটেড ট্রী ক্রীপার’ পাওয়া যাচ্ছে, তাও এক জোড়া। আর কেউ আছে কিনা কেউ জানেনা। আবার সেই একজোড়ার ছবি তুলতে সারা বিশ্বের আমার মত ক্যামেরাবাবুরা হাজির। তারা দৌড়ে মরছে এ গাছ থেকে ওগাছ। বেচারি ওই জোড়া মেটিং করে বাচ্চাও তুলতে পারবেনা হয়ত। বেডরুমেই তো সিসিটিভি ২৪X৭ ।


যাই হোক , এটা স্পটেড নয়, ‘বার টেলড ট্রী ক্রীপার’। বার টেলড মানে, এদের লেজে ‘বার’ অর্থাৎ সমান্তরাল দাগ থাকে। এটা অমন দুষ্প্রাপ্য নয়, খুব পাওয়া যায়।




পরেরটি আমাদের আলোচ্য, অর্থাৎ পাখি নয়, তবু সামনে এসে পড়ল যখন, এর নাম মাঞ্জ্যাক(muntjac) বা বার্কিং ডিয়ার। এবার বার্ক অর্থাৎ কুকুরের মত আওয়াজ করে ভয় পেলে। তবে ঘেউ ঘেউ নয়, একটা করে ডাক ছাড়ে, কিছু উঁচু জাতের কুকুরের মতো। এটি পুরুষ, শিঙ টিং বাহারি। এখানে কয়েকটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে, তারই একটির পাশ দিয়ে যাবার সময়ে এর দেখা পেলাম।




এবারে চলুন রডোডেন্ড্রন গাছ দেখা যাক, তবে দূর থেকে এখানে তেমন গা করেনা কেউ। তবে বুরানশ স্কোয়াশ বানানোর জন্য বস্তা বস্তা তুলে নিয়ে যায়, যেগুলো হাতের নাগালে আছে। যেগুলো নেই, সেগুলো দূর থেকে আলো করে রাখে চার দিক। এখানে শুধু রডোডেন্ড্রন নয়, যত্ন করলে অনেক কিছু করা যেত, আর একটা সিকিমের ভার্সে বানানো যেত। কিন্তু কারও গা নেই। যাই হোক, দূর থেকে ছবি দিচ্ছি, বড় করলে অনেক কালারফুল হতো, ইচ্ছে করেই স্বাভাবিক রাখলাম।



সেই যে গ্রীন টেলড সানবার্ড দেখি্যেছিলাম একটু আগে, তার আসল চেহারাটা আলোর বিপরীতে বোঝা যায়নি একদম। এখানে দেখুন তার আসল রঙ। পাখিটা খুব কালারফুল বটে। এই প্রসঙ্গে, সানবার্ড বা মৌটুসি পাহাড়ের দিকে দারুণ রঙীন হয়, আরও একটা দেখাব এখানে একটু পরে। আমাদের সমতলে যে দুটি পাওয়া যায়, তাদের এত রঙ দেননি ডারুইন কিংবা ঈশ্বর। কিন্তু রঙীন ফুলে্র ক্যামোফ্ল্যাজ বলে নয়। যে যে ফুলে এরা বসে নিয়মিত, তাতে খানিক ধন্দ জাগে, আসলে বিবর্তনটা কীভাবে হয়েছিল। যাক সে প্রণীবিদ পণ্ডিতদের ব্যাপার। চলুন পাখিটা দেখা যাক।



দেখুন রডোডেন্ড্রন গাছে একাধিক বসেছে, সামনেরটি স্পষ্ট। ফুলের সঙ্গে গায়ের রঙের কোনও মিল নেই। ইন ফ্যাক্ট এই বিশেষ পাখির মতো রঙের ফুল আমি এখনও দেখিনি। ছিল হয়ত, নইলে বিবর্তন কেন হবে। মানুষের রাস্তা বানানোর চক্করে সেসব ফুল হয়ত হাপিস।



এ পাখিটার নাম রুফাস গরজেটেড ফ্লাইক্যাচার। এটি স্ত্রী পাখি। এদের গরজেট মানে গলার ভাঁজে একটু রুফাস, মানে লালচে বাদামি রঙ থাকে। এটি স্ত্রী বলে সে রঙ খুব আবছা, পুরুষ হলে একটু ঘন হতো। দু তিন দিন আগে, ফেসবুকে একটি ছবি দেখলাম, খুব স্পষ্ট ছবি, প্রত্যেকটি রোম চেনা যাচ্ছে। মানুষ দেখলে তারিফ করবেনই। কিন্তু যা গায়ের রঙ দেখা গেল সে ছবিতে, তা এর রঙ নয়। আমি আমার আমপাড়া ক্যামেরার শত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করি এই কারণে, যে রঙ সে দেয়, তা অবিকৃত।



এ পাখিই আলোয় দেখুন, হালকা রুফাস রঙের ছোঁয়া গলার ভাঁজে।



আমি আগে বোধহয় অনেকবার বলেছি ওয়ার্বলার গোত্রের ন্যূনাধিক ১০৩ রকম পাখি আছে ভারতে। তারা অনেকে এত কাছাকাছি দেখতে, যে আইডেন্টিফাই করা একেবারে দুঃসাধ্য। ফেসবুকে কিছু বার্ডিং গ্রুপ আছে। তাতে আছেন নানা পক্ষীবিদ ও আন্তর্জাতিক পণ্ডিত। সবাই তাঁদের মত নিতে যান নিজে না পারলে। আমি কিন্তু সেই সব আন্তর্জাতিক মানুষকেও ভুল আই ডি করতে দেখেছি ওয়ার্বলারের। তবে এদের মধ্যে কিছু আছে যারা সহজেই আইডেন্টিফায়েবল। এটি তেমনই এক পাখি, এর নাম ‘অ্যাশি থ্রোটেড ওয়ার্বলার’, অর্থাৎ ছাই রঙা গলা ওয়ালা ওয়ার্বলার।



এবার এক মজার জিনিস দেখিয়ে আজকের পর্ব শেষ করব। আমি আগে বেশ কবার বলেছি, আমার ক্যামেরা ক্যাননের এবং মধ্যবিত্তের তুলনায় যথেষ্টই দামি। বডি আর লেন্স মিলিয়ে লাখ আড়াই ছিল যতদূর মনে পড়ে। তা এ ক্যামেরা নীল আর হলুদ রঙ ফোকাসে অক্ষম, একথা অনেকবার বলেছি। মানুষ শুনলে হাসেন, ক্যামেরা সার্ভিস সেন্টারের মানুষরা হাসেন। হাসি স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি। একমাত্র ব্যাকবাটনে কাজ হয়, কিন্তু তাও এখন ডিফাঙ্কট। নীচে দিচ্ছি পরপর ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার পুরুষ ও স্ত্রীর ছবি পরপর। ভার্ডিটার এত সহজলভ্য কিন্তু পেলে সবাই তোলে। নিজের স্টকে হাজার দুয়েক থাকলেও।

দেখুন পুরুষ ফোকাসে নেই -



কিন্তু স্ত্রী শার্প ফোকাসে আছে।




এই রুফাস গরজেটেড ফ্লাইক্যাচার প্রসঙ্গে একটা গল্প বলব আগামি পর্বে। ছবিটা তখন আর একবার দেব।

(চলবে)





Friday, 4 May 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৮






চোপতা, 
কী অপার সৌন্দর্য, বর্ণনা করি কীভাবে! ধরুণ যদি নীচের ছবিটাই দেখাই, (ছবিতে ক্লিক করলেই বড় করে দেখা যায়) প্রথমে গাঢ় সবুজের স্তর, তারপর হালকা থেকে হলুদ, তারপর লাল দিগন্ত জুড়ে। তার ওপারে নীল পাহাড়। দেখতে কি পাচ্ছেন? না। কিন্তু কোনও উপায় নেই এর চেয়ে ভাল করে দেখানোর। যেখানে শুধু বরফ আর পাহাড়, আর কিছু মেঘ, সেখানে দারুণ ফোটোগ্রাফি করা যায়। কিন্তু এখানে যায়না। একেই তো আমার নরমাল লেন্স নেই। আগে একটা বাড়তি ক্যামেরা আনতাম, কিন্তু দলের সঙ্গে এলে সেটাও বার বার বের করা ঢোকানোয় অসুবিধে। আমার আসাম ট্যুরে একাই ছিলাম বলে সে সব ছবি অনেক তুলেছি। যাক ছবিটা দেখাই, কিছুই বুঝবেন না যদিও।



জঙ্গলের রূপ ছবিতে বোঝানো যায়না। একেবারেই যায়না তা নয়, খুব দামি ইকুইপমেন্ট, মানে চার পাঁচ লাখি লেন্সে কিছুটা আনা যায়। তবে পাখিপাড়া লেন্সে তা একেবারেই অসম্ভব। যে তিনটে লেয়ারের রঙে মুগ্ধ হয়ে এ ছবি নিয়েছিলাম, তা দেখানো গেলনা। যাবেনা জানতাম। আমি নিজেই মুগ্ধ চোখে দেখি আরকী!



আরও অসুবিধে হলো, আমাদের এবারের ড্রাইভারটি কুমায়ুনের দীনেশ নয় (এখানকার গাইডের নাম আবার দীনেশ) এই যুবকের নাম মুকেশ রাণা। গাইডের পেটোয়া, আমাদের কাছ থেকে যা ভাড়া হওয়া উচিত, তার অনেকটাই বেশি নিয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও এখানে একটু দাঁড়া বাছা, একটা ছবি তুলে নিই, বললে সে দাঁড়াবেনা। তার প্রভু না বললে তার আদেশ সম্পূর্ণ হয়না। শুধু তাই নয়, আমি তো পাহাড়ে ঘুরছি হাফ পেন্টুল থেকে। যেখানে সেখানে দাঁড়াও বললেই হয়না। বাঁকের মুখে, যেখানে রাস্তার পাশে মার্জিন বেশি, দুটো আপ ডাউনের গাড়ি অনায়াসে যেতে পারে, সেখানেই দাঁড়াতে বলি। তবু সে দাঁড়ায় না। তাই কিছু অমূল্য ছবি দেখাতে পারবনা আপনাদের। হ্যাঁ পাখির ছবি হবে, এই তো দিচ্ছি, এপাখিটার নাম স্কেলি বেলিড উডপেকার (ফিমেল) অনেকক্ষণ ধরে অদ্ভুত আওয়াজ করে ডাকছিল। এর ছবি আমি ছাড়া কেউ নেয়নি বোধহয়। গাইড দীনেশ বন্ধুদের অন্য কিছুর দিকে পরিচালিত করছিল।




এর পরের ছবিটা হতাশার, তবু দেব এখানে। এর নাম কোল টিট। কিন্তু আমি ছবি তুলতে পারিনি। পারিনি অর্থে, এটা ছবি নয়। এ এমনই পাখি, যাকে সম্পূর্ণ প্রোফাইল, মানে পাশ থেকে ঠোঁট আর লেজ পর্যন্ত না দেখানে এর কিছু বোঝা যায়না। এ এলাকায় কোল টিট অনেক আছে। বিশ্বজিত একটাকে পেয়েছে দেখলাম। আমি অনেক ছবি নিয়েছি, কিন্তু সবই এরকম।



এবার পাখি নয়, পশু, পাহাড়ি ছাগল, বন্য। কুমায়ুনে পঙ্গোটে এদের ছবি দিয়েছলাম অনেক দূর থেকে। এখানে একদম এদের টেরেন এ ঢুকে পড়েছি। এদের কেতাবি নাম হচ্ছে হিমালয়ান তাহ্‌র (Tahr). উচ্চারণটি কষ্টসাধ্য, তাই স্থানীয় বা বাইরের লোক, অনেকেই ‘থার’ বলেন। কিন্তু আসলে তাহ্‌র। এদের চেয়ে অনেকটাই অন্যরকম, বড় শিঙ ওয়ালা নীলগিরি তাহ্‌র পাওয়া যায় পোরতিমুণ্ড গেলে। একবার গেছিলাম, ইহজীবনে আর যেতে পারব বলে প্রত্যয় নেই। আপনাদের বলি, কেউ যদি পারমিশন নিয়ে(অথবা লুকিয়ে, ঘুষ দিয়ে) যেতে পারেন, স্বর্গ কাকে বলে, একটা আন্দাজ নিয়ে আসবেন। মানে দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতির মধ্যে আপনি ছাড়া কেউ নেই, কেউ না। বেশি দলবল নিয়ে যাবেন না, ধরা পড়ে যাবেন। দুজন আইডিয়াল, ‘আপনারা দুজন’।



হিমালয়ান তাহ্‌র একটু কাছ থেকে। আমাদের দুর্ভাগ্য, ফিরে আসার পথে এদের এক শিশুকে দেখলাম পাহাড় থেকে পড়ে গেছে রাস্তায়, মৃত। কচি বাচ্চাটা কী সুন্দর, কিন্তু প্রকৃতি প্রাণ কেড়ে নিল।



এবার এক পাখি দেখাই। সকালের দিকে এক জায়গায় আমরা দাঁড়িয়েছি, কী কাজে মনে নেই। সামনে কয়েকজন জনমজুর রাস্তার কাজ করছিলেন। বেশ কয়েকটা বাঁদর সামনে এদিক ওদিক লাফালাফি করছিল। এদিকে সেই প্রথম দিন থেকেই আমার জায়গা হয়েছে পেছনে। কারণ পেছনে যেই বসছে, তারই বমি হচ্ছে। আমি তো নীলকণ্ঠ, কিছুই হয়না। তাই আসেপাশে কোনও পাখি থাকলেও দেখতে পাইনা। তা বিশ্বজিত হঠাৎ নেমে গেল। গিয়ে কী একটা তুলছে মনযোগ দিয়ে। ওখানে বাঁদর ছাড়া কিছু ছিলনা, মানে অন্যরা কেউ দেখিনি। আমার তো প্রশ্নই নেই, পেছন থেকে কিছুই দেখা যায়না। অনেকক্ষণ ধরে সে অত মনযোগ দিয়ে কী তুলছে, এই অনুসন্ধান করতে একে একে সামনের লোকজন নেমেছে। আমি অনেক পরে। এদিকে খাদের দিক থেকে মজুররা উঠে আসছেন। আমি তো বললাম অনেক পরে নেমেছি। দেখি কী, একটা ছোট্ট পাতাবিiহীন গাছে অনেকগুলো একই জাতীয় পাখি। এদিকে মজুররা প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তাঁদের হাত নেড়ে প্রাণপনে বলছি, পিছিয়ে যাও, পিছিয়ে যাও, পিছে হঠো। তাঁরাও কিছু বুঝছেন না কিন্তু ঘাবড়ে যাচ্ছেন। পাখিরাও ঘাবড়েছে বিস্তর। তারা উড়ে পালাবার আগে গোটা চারেক শট মারতে পেরেছিলাম। তারপর মনিটর দেখে মাথা চাপড়াচ্ছি, এগুলো অ্যালপাইন অ্যাকসেন্টর। চট করে পাওয়া যায়না। কিন্তু আমি প্রচণ্ড এক্সাইটমেন্টে লেন্স খুলতে ভুলে গেছি। সব উঠেছে একশোয়। এমনিতেই অন্যদের ৫০০ কিংবা ৬০০। আমারই চারশো। তাও খোলা হয়নি। আমি কপাল চাপড়াচ্ছি। আর কি চোপতা আসতে পারব? আহা অ্যালপাইন অ্যাক্সেন্টর। বিশ্বজিত তো রেগে লাফাচ্ছে, আপনি ভাবলেন আমি বাঁদরের ছবি তুলছি, বাঁদরের? আমি কি পাগল? নিন এবার একশোর স্ন্যাপ নিয়ে বসে থাকুন। তা ঈশ্বরের দয়া হলো। এই জায়গায় এসে আবার তাকে পাওয়া গেল। এক ঝাঁক নয়, একটাই। আর আমারও একটাই শট হলো। তাও হলো তো!




দূরের আকাশ থেকে নীচু ফ্লাইটে একটা পাখিকে উড়ে আসতে দেখা গেল। খুঁজছিলাম এটাকে। গাইড দীনেশও বলল, উওহ লিজিয়ে আপকা ‘ল্যামারগিয়ার’। আমার পুরনো পাঠকদের মনে থাকবে কুমায়ুনে দীনেশ(সেই দীনেশ) কিছুতেই ল্যামারগিয়ার বলতে পারেনা। খালি বলে ‘গ্ল্যামার’। সোমনাথ পড়ল তার পেছনে, বলল, ‘গাড়িকা গীয়ার হোতা হ্যায় না, উওহ ‘গীয়ার’। অওর উসসে পেহলে ‘ল্যামার’। তা দীনেশ তাও বলে গ্ল্যামারগিয়ার। যাই হোক ওখানকার পাখিটাকে তিন বছর ধরে টার্গেট করছি, সে বালক থেকে কিশোর, সেখান থেকে টীনএজার হব হব করছে। এরা মানুষের মতো, অনেক ধীরে বাড়বৃদ্ধি। তা বড় না হলে তো পুরো রঙ খুলবেনা। এখানে কিন্তু পাখিটা বড়ই এবং পুরুষ।



আরও কাছে এলে আর একটু ভাল শট নেওয়া গেল। কিন্তু শার্প হলোনা। তবু চোখ দেখা যাচ্ছে। এরা ল্যামারগিয়ার ওরফে ‘বেয়ার্ডেড ভালচার(দাড়িওয়ালা শকুন)। দাড়িটা দেখতেও পাচ্ছেন,(বড় করে দেখুন) ছোট্ট নুর টাইপের দাড়ি। এরাই একমাত্র শকুন যার গলার পালক থাকে আর অমন কুৎসিত দেখতে হয়না। বসে থাকা অবস্থায় দাড়ির জন্য খানিক ভুতুড়ে লাগলেও খুবই সুন্দর এই শকুন। অবশ্য বসে থাকা অবস্থায় পাইনি তাকে আমরা এবার।



(চলবে)


Thursday, 3 May 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) – ১৭






অনেক তো নিসর্গ টিসর্গ দেখা হলো, এখন তো পাখি দেখা হবে, নাকি? কিন্তু ম্যান প্রোপোজেস, গড এক্সপোজেস। মানে এক্সপোজেস ইউ টু সামথিং বিয়ন্ড ইয়র এক্সপেক্টেশন। এই পাখি বা পশুর ব্যাপারেও, মানে আমি পশুতে অত ইন্টারেস্টেড নই তাই, মানুষ যা চাইবে তক্ষুণি তা পাওয়া নাও যেতে পারে। কিন্তু এক সময়ে না এক সময়ে জুটে যাবেই। আসলে কয়েক মাস আগেই কুমায়ুন ট্যুরে আমি বেশ কয়েকটা কাঠঠোকরা পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি মানে বেশ ভাল ভাল স্ন্যাপ পেয়েছি। এমনিতে তারা সংগ্রহে আগেও ছিল। কিন্তু আলো কমে গেছিল বলে ‘ধওলছিনা’তে  একতা হিমালয়ান উডপেকার পেয়েও তেমন ভাল হলনা। তাই আমার পুরো কন্সেন্ট্রেশন এখন তার দিকে। সেই হিমালয়ান উডপেকার পেতে গিয়ে কত বড় মিস হয়ে গেল বলি। আগে ছবি একটা দেখুন তার। এটা ফিমেল। কাঠঠোকরাদের স্ত্রী পাখিদের মাথা হয় কালো নয় বিবর্ণ হয়। পুরুষদের লাল। 



আমরা তো আগের জায়গাটা থেকে বেরিয়ে অন্য দিকে যাচ্ছি। আমি কিছুই চিনিনা, মনেও রাখতে পারিনা। বিশ্বজিত দেখি দুমদাম নাম বলে দেয়। অবশ্য কুমায়ুনের কিছু জায়গা আমি নখদর্পনের মতো চিনি। নামও জানি। কেন এমন হয় কে জানে। যাই হোক এ্টা কুমায়ুন নয়, গাঢ়ওয়াল। আমি কিচ্ছু না জেনে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছি। এর মধ্যে একটা পাখি বোধহয় কৌশিক মাইতি স্পট করেছে। তার অসম্ভব ভাল চোখ। পাখিটা সামনে থেকে পেলাম কিন্তু পাশ থেকে পেলে আসল রঙটা বোঝা যেত। যাক কী আর করা। এর নাম হোয়াইট ব্রাওড শ্রাইক ব্যাবলার



এবার গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা। বেশ খানিকটা গিয়ে নেমে পড়া। আমার বন্ধুরা সব যাচ্ছে হেঁটে হেঁটে। গাইড কোথাও একটা গেছে। আমি একটু পিছিয়েই পড়েছি কিছু একটার ছবি তুলতে গিয়ে। এদিকে অম্লান আর কৌশিক মাইতি থেমে কী একটা আলোচনা করছে, আমি এগিয়ে গেলাম।



শুনলাম ওরা বলছে একটা কাঠঠোকরার আওয়াজ পাচ্ছে। আমি চোখ সরু করে খুঁজতে থাকি। ওই ওই তো, একটা হিমালয়ান উডেপেকার, যাঃ উড়ে গেল। নীচের দিকে নেমে গেল মনে হচ্ছে। কে যেন বলল আর একটা আছে ধারে কাছে। আমি খুঁজে যাচ্ছি তন্ময় হয়ে, একে আমার লাগবেই। তাকে মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছি এদিক ওদিক, আবার কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। তার পেছনেই ক্যামেরা তাক করে একবার এপাশে, একবার ওপাশে দৌড়চ্ছি। তাকে পেয়েও আর গোটা তিরিশেক ছবি নিয়েও যেন মনে হচ্ছে কোনওটাই শার্প ফোকাস হলোনা। এদিকে ব্যাক বাটনটাও খারাপ হয়েছে, কোনও কাজই করছেনা। তাই আমি লেগেই আছি ওর পেছনে।



হঠাৎ কানে একটা অদ্ভুত আওয়াজ এল। আওয়াজটা আমার চেনা। এটা রেকর্ডেড কলারড আউলেটের ডাক। কলারড আউলেট একটা ছোট্ট পেঁচা। কিন্তু এর ডাক বাজালে ছোট ছোট রঙিন পাখিরা, মানে টিট, ইউহিনা, ওয়ার্বলার, এরা যেখানেই থাক, ছটফট করে বেরিয়ে আসে। ও ডাক আমার মোবাইলেও লোড করা আছে। আসলে পাখিদের মেটিং কল যান্ত্রিক ভাবে বাজিয়ে বের করে আনা এথিকালি অনেকের পছন্দ নয়। আমার নিজেরই নয়। কারণ সমানে একটা নকল ডাক শুনতে শুনতে পাখিরা আসল ডাক শুনেও মেট করতে চাইবেনা। ভাববে ওই দুপেয়ে জন্তুগুলো বাজাচ্ছে। তাতে এদের বংশরক্ষাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তার চেয়ে এটা বাজানো ভাল। কলারড আউলেটের ডাক বাজালে ছোট পাখিগুলো যখানেই থাকুক হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে। দেখতে আসে, তাদের পরম শত্রু ঠিক কোথায় বসে আক্রমণের প্ল্যান ভাঁজছে।


তা সেটা কেউ বাজাচ্ছে, নাকি সত্যি কলারড আউলেট এল একটা? দেখি আমি যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ হিমালয়ান উডপেকারের ধ্যান করছিলাম, তার ঠিক ওপরের রাস্তায় গাইড দীনেশ একটা মোবাইল আর একটা ব্লু টুথ স্পিকার নিয়ে ডাক বাজিয়ে চলেছে আর আমার বন্ধুরা পটাপট স্ন্যাপ নিচ্ছে। ডাক বাজালে সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিতে হয়, নইলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাঁওতা টা ধরা পড়ে। আমি পড়ি কি মরি করে ওপরের রাস্তায় উঠে এলাম। ততক্ষণে যে পাখিরা বেরিয়ে এসেছিল, তারা ফিরে যাবার তাল করছে। আমি একটাকে টার্গেট করে ক্যামেরার শাটার মারতে লাগলাম।


আসলে কী হয়, এই ছোট্ট পেঁচার ডাক বাজালে ছোট ছোট পাখিগুলো ভয়ে দৌড়োদৌড়ি করতে থাকে এ্ডাল থেকে ওডাল। খুব ফাস্ট মুভমেন্ট। তাই যে কোনও একটাকে টার্গেট করে বার্স্ট চালাতে হয়। এমনই কপাল, আমি যেটাকে প্রথম ধরলাম, সেটা একটা ওয়ার্বলার। আর কী ওয়ার্বলার কে জানে, কারণ চোদ্দ পনেরটা শটের মধ্যে মাত্র দুটো হলো, তাও খালি মুখ আর লেজ দেখা যাচ্ছে, বাকি শরীর পাতার আড়ালে তাই ওটা আর দিলাম না। এদিকে পাখিগুলো বুঝে গেছে যে ফলস পেঁচার ডাক বাজাচ্ছে কেউ। তাই তারা এবার যে যার গাছে বা ঝোপে ফিরে যাচ্ছে।  এর পরে যেটা ওপেন পার্চে এসে বসল, আমি বাধ্য হয়ে সেটাকেই টার্গেট করলাম। এটা একটা গ্রীন টেলড সানবার্ড



এ পাখি আমার অনেক আছে। শুধু তাই নয়, খুব কাছ থেকে তোলা দারুণ শট আছে। এর পেছনে না থেকে অন্য নতুন পাখির দিকে সেতে পারতাম। কিন্তু তা হয়না। এই ছুটোছুটির মধ্যে যে্টা সামনে পাওয়া গেল, তাকেই নিশানা করতে হয়। বন্ধুদের কেউ কেউ আলট্রামেরিন ফ্লাইক্যাচার পেয়েছে। আমার আছে, কিন্তু ভাল শট নয়। তাই খানিক খেদ রয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে বড় আ্ফশোষ, ওই ভিড়ে একটা ফায়ার ক্যাপড টিট ছিল। সেটা কেউই পায়নি। ওটা কেউ পেলে আমায় সুইসাইড করতে হতো। ভাগ্যিস কেউ পায়নি। যাক সেই পাখিই চোখ পাকিয়ে ক্যামেরাম্যানকে দেখছে, তাই দেখাই।



এর মধ্যে বিশ্বজিত আমার একটা ছবি তুলল। খাদের অত ধারে দাঁড়ানোটা ঠিক হয়নি, বলুন?



(চলবে)


Tuesday, 1 May 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৬





দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা......দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া



ককল্যাসের আশা ছেড়ে একটু এগিয়েছি, চোখ আটকে গেল পথের ধারে। এই যে সব অমূল্য সম্পদ পড়ে ছিল, এদের নিয়ে কোনও গবেষণা হয়না, হলেও আমি তার খবর জানিনা। পথের ধারেই এদের পাওয়া যায়। গভীর জঙ্গলে, বিশেষত পাহাড়ি জঙ্গলে যতদূর যেতে পেরেছি, আমি অন্তত দেখিনি এদের। একবার ভাবুন তো, তুলে এনে বাহারি টবে লাগিয়ে একটু পরিচর্যা করলে কী দাঁড়াবে এর চেহারা? কয়েক পর্ব আগেই লিখেছি, তাজ হোটেলে একটা সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে গিয়ে কেয়ারি করা ল্যানটানা দেখে আর চোখ ফেরাতে পারিনা। হদ্দ জঙলি ফুল, তাও বিদেশ থেকে অবাঞ্ছিত, তার আজ পাঁচতারায় ঢুকে কতটা মর্যাদা বৃদ্ধি পেল। রূপও কত খোলতাই হলো।



এই ফুলটা প্রথমে পুরো গাছটা, পরে ক্লোজ আপ দেখাব। ভারত সরকার চার ধাম যাত্রা সহজতর করার জন্য সিক্স লেন রাস্তা বানাচ্ছে। কিছুদিন পরে এদের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দেশের মানুষ নির্বিচারে গাছ কাটছে। কেবল পাতা পড়ছে, ঝাড়ু লাগাতে কষ্ট বলে প্রতিবেশিদের চাপে গাছ কেটে ফেলতে হচ্ছে বলে আমার কাছে কান্নাকাটি করে মেসেঞ্জার বা ই-মেল আসে। আমি বলি, প্রতিরোধ করো, হাতে লাঠি নাও, মুখে খিস্তির বান ছোটাও, একটু ছোটলোক হও। ইতরদের সঙ্গে ভদ্রাচরণ করো কেন? কিন্তু সরকার কে আপনি কী বলবেন? কেদারে নাকি লেসার শো শুরু হয়েছে বা হবে। কমার্শিয়ালাইজেশন অফ রিলিজিয়ন। পথের ধারের এই সুন্দরীদের বলি দিয়ে ছয় লেনের রাস্তা হবে। ছেলেবেলায় গুরুজনদের মুখে শুনেছিলাম তীর্থ মানেই দুর্গম। যে স্থানে সহজে যাওয়া যায়, সেখানে তীর্থ হতে পারেনা। কষ্ট না করিলে নো মিলিং অফ কেষ্ট। এত সুলভে ‘ভগওয়ান’ দর্শন হোগা? আগের বার দশ হাজার মরেছে, এবার এক লাখ যাক। শুধু দুঃখ এই, যারা ড্যাম বানিয়েছিল, তারা মরেনি। যারা ‘ভগওয়ান’ দেখতে গেছিল, মরেছে তারাই।


আমরা পোথিবাসা তে যেখানে উঠেছি, সেই হোটেল বা রিসর্টে ঢোকবার মুখেই দুধারে টবে দুটো গাছ। হাত দিয়েই বুঝলাম জঙলি। কিন্তু ফুলের কী রঙ, আহা। কী দুর্ভাগ্য আমার যে ছবি তুলে আনার কথা ভেবেও পরে ভুলে গেছি। হোটেল মালিক বা ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, তুলেই আনা, তবে কোথা থেকে, তিনিও জানেননা।  যাই হোক ওপরের ফুলটা বড় করে দেখুন।




চলুন পাখি দেখা হোক এবার। এর পর যাকে পেলাম, তার নাম ‘চেস্টনাট বেলিড রক থ্রাশ’। এত সব মাইগ্র্যান্টদের মধ্যে ইনি স্বদেশি, অর্থাৎ স্থানীয় পাখি, কোথাও থেকে আসেননি, ফিরে যাবেনও না কোথাও। আর একটা কথা, আপনারা যাঁরা নতুন পাখিবাজি শুরু করেছেন, এই পাখি ও এর কয়েকটি কাজিন ব্রাদার, খোলা মগডালে বসেন, যাকে আমরা বলি ‘ওপেন পার্চ’। প্রথম প্রথম এদের ছবি তোলায় বেশ মজা, ফাঁকায় ফাঁকায়।





এর পর একটা ওয়ার্বলার দেখাই, এর নাম ব্লাইদস লীফ ওয়ার্বলার। আপনাদের মধ্যে কেউ যদি পাখিবাজিতে আগ্রহী হয়ে থাকেন, ওয়ার্বলার আমাদের দেশে রয়েছে কমবেশি ১০৩ রকম। আমাদের চিরপরিচিত টুনটুনি এক ধরণের ওয়ার্বলার। বেশ কিছু ওয়ার্বলার আইডেন্টফাই করতে বড় বড় বার্ডারদের কালঘাম ছুটে যায়। কারণ এই ১০৩ এর অনেকেই খুব কাছাকাছি দেখতে। তবে কয়েকজনকে ধরা খুব সহজ, যেমন এই ব্লাইদস লীফ ওয়ার্বলার। এদের ঠোঁটের রঙ হয় কমলা। আর কোনও ওয়ার্বলারের কমলা ঠোঁট হয়না। আর একটা মজার কথা বলি, আমার এই ভুতুড়ে ক্যামেরা নিয়ে। কিছু পাখির ছবি আমার ক্যামেরা নিতেই চায়না, আগে বলেছি খেয়াল করবেন। আমি বিভিন্ন এক্সপোজার ট্রাই করেছি এই পাখিটার ওপর। সব সময়েই ওভার এক্সপোজড। আজ পর্যন্ত অগুন্তি ছবি নিয়েছি ব্লাইদস লীফ ওয়ার্বলারের। সবই ওভার এক্সপোজড। জানিনা বিজ্ঞান টা কী।



চোপতাতে আর এক আশ্চর্য রকম সুন্দর দৃশ্য হলো এর গাছ। এখন তুঙ্গনাথে বরফ থাকলেও অফিশিয়ালি গরম পড়েছে। তাই বেশ কিছু গাছের পাতা টুকটুকে লাল হয়ে গেছে। আগের ওয়ার্বলারের ছবিতেও দেখুন পাতাগুলো লালচে হতে শুরু করেছে। এবার দেখুন টুকটুকে লাল পাতা। চারদিকে এমন সব গাছ। এমনি তে রডোডেন্ড্রন ফোটার সময় এখন। তাই ফুলে ফুলেও লাল কিছুটা। কিন্তু সিকিমের মতো এত রডোডেনদ্রন নেই এখানে। তা পুষিয়ে দিয়েছে এই পাতা। কত রকমের গাছের পাতা যে লাল হয়, তা বলে বোঝানো যাবেনা।



আর সবচেয়ে বড় বড় ঝাঁকড়া গাছগুলো  আখরোটের, তা জানলাম। আমি কুমায়ুনেও আখরোটের গাছ দেখেছি, তবে তা এই সময়ে নয়। এখন হয়ত লাল হয়। কুমায়ুনে এক দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ড্রাইভার আমাকে আখরোট পেড়ে খাওয়ালেনও। কিন্তু এটা বেশ অদ্ভুত, এখানে, আখরোট, আপেল, কমলা, সবই হয়। কিন্তু কাশ্মিরের মত কোথাও বিক্রি হতে দেখিনি। কুমায়ুনে আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের কাছে একটা বাচ্চা ছেলে থলিতে করে এনে আখরোট বেচার চেষ্টা করছিল। বেশ কিছুক্ষণ দরাদরি করে দামে পোষালনা বলে ফিরে গেল। তবে রাস্তায় বা বাজারে দেখিনি কোথাও। কী করে এরা আখরোট, আপেল টাপেল দিয়ে?



আর খানিক এগোতেই তুষারশৃঙ্গ একেবারে হাতের কাছে। ওদিকেও লাল পাতার গাছ। কিন্তু নরমাল লেন্স নেই বলে পুরো দৃশ্যটা দেখাতে পারলাম না। হতচ্ছাড়া মোবাইলটাই বা কোথায় ছিল?




(চলবে)






Monday, 30 April 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৫





ককল্যাস koklass এর খোঁজে



কালকের ছবিটা সকলেই ঠিক বলেছেন। কিন্তু ফেয়ার প্লে হয় নাই। ছবিটা ওই অবস্থায় দেখতে হতো। এনলার্জ করে নয়। আসলে ওই অবস্থায় দেখেও বলে দেওয়া যায় কিন্তু খালি চোখে যা দেখেছি, তা দেখলে কারও সাধ্য ছিলনা। আমি জঙ্গলে গেলে এমন জিনিষ সংগ্রহে রাখি। আমার তাড়োবা ট্যুরে একটা চাইনিজ ড্র্যাগন পেয়েছিলাম। সেটা বেশ সমাদৃতও হয়েছিল পাঠক/দর্শক মহলে। যাক ছবিটা আবার দিচ্ছি। সব কটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমনটি দেখা গেছে। কেবল কান দুটো আবার ঠোঁট বলেও চালানো যায়, যদি মুখটা ওপরে করা আছে মনে হয়। সে ছবিটাই দিচ্ছি নীচে।



এদিন মোনাল দেখার পর আলো কমে গেছিল। খানিক মেঘলাও হয়ে গেছিল। আমরা হোটেল বা যাই বলা হোক, সেখানে ফিরে গেলাম। জায়গাটি লোকেশনের দিক থেকে যথেষ্টই ভাল। ঘরদোরও বেশ ভাল। শুধু এক ঘরে তিনজনের থাকা একটু চাপের। তা এক ঘরে বিশ্বজিত-হিমাদ্রী, আর এক ঘরে দুই ডাক্তার ও তৃতীয় ঘরে আমার ঠাঁই হলো। একটা কথা বলে নেওয়া হলো, যে এই ঘরটার জন্য কিন্তু পুরো ভাড়া দেওয়া হবেনা। যাই হোক অ্যাকোমোডেশন বেশ ভাল হলেও এখানে খাবারের দাম অস্বাভাবিক বেশি। আবার একই খাবার ভিন্ন দিনে ভিন্ন দামে এসেছে। সে সব ডিটেলে গিয়ে লাভ নেই। আসলে গাইডের সঙ্গে এই হোটেল ও আমাদের গাড়ির একটা বন্দোবস্ত ছিল। আমাদের পোথিবাসায় এক রাতই থাকার কথা। পরের দিন আমাদের চোপতায় শিফট করার কথা ছিল। শোনা গেল গাইড নাকি বলেছে, আমরা এখানে থাকি তাইও নাকি ও চায়। এমনিতে আমাদেরও যে খুব আপত্তি ছিল তা নয়। পরে বুঝেছি, এখানে থেকে লাভ বই লোকসান হয়নি। কেবল খাবারটা পরের দিকে যেমন নিচ্ছিল, প্রথম দেড়দিন যদি তাই নিত।

পরদিন খুব ভোরে আমরা বেরিয়েছি। সেদিনের টার্গেট ‘ককল্যাস ফেজ্যান্ট’। আসলে মোনাল মোনাল করে পাবলিক ক্ষেপে গেলেও এটাই মূল টার্গেট হওয়ার কথা ছিল। আমার নিজের তো ছিলই। ককল্যাস কে খুব ভাল ভাবে ক্যামেরায় তোলা বেশ কঠিন, কারণ, মানুষ দেখলেই সে প্রাণভয়ে দৌড়ে বা উড়ে পালায়। এর গায়ের রঙ একেবারেই মোনাল সুলভ উজ্জ্বল কিছু নয়। তবে ভাল করে ঠাওর করলে অন্তত আমার চোখে তো সে মোনালের চেয়ে কম কিছু নয়। আমি খুব করে মুখিয়ে ছিলাম ককল্যাসের জন্য। এদিকে আমার কিছু হ্যান্ডিক্যাপও ছিল। আমি কিছু লোকের কথায় এবং আমার এক বিদেশি ফেসবুক বন্ধুর ছবি দেখে ক্যাননের সে্ভেন ডি কিনেছিলাম। তার সঙ্গে ১০০-৪০০ লেন্সও সেই বিদেশি বন্ধুর দেখাদেখিই। কিন্তু কিছুদিন ব্যবহার করেই বুঝলাম এতে অনেক ডিফেক্ট। নেটে রিভিউ গুলো পড়ে দেখলাম সারা পৃথিবীর নামকরা ফোটোগ্রাফাররা বলছেন সেভেন ডি তে ৪০০-র বেশি আইএসও তে তুললেই ফেটে যায়। এদিকে আমার যত পরিচিত বেশির ভাগই নিকন ব্যবহার করেন। তাঁরা ৩২০০ তেও বেমালুম তুলে যাচ্ছেন। অথচ কেনার আগে আমার তখনকার পরিচিত সবাই বলেছিলেন এটা দারুণ ক্যামেরা। এখন অনেকেই বদলে নিতে বলছেন। কিন্তু দুম করে এক দেড় লাখ খরচ করাও বেশ চাপের। আমি তেমন বিত্তবান তো নই। এর ওপর আর এক অসুবিধে। আমার লেন্স চারশো। আমার সঙ্গের অনেকেই বা সকলেই ন্যূন্তম ৫০০, অনেকে ৬০০ দিয়ে তুলছেন। সে সব লেন্স কিনতেও আরও প্রায় সম পরিমান টাকা লাগে। তাই সে সব দেখে খানিক ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগি। আমায় যাঁরা উস্কেছিলেন সেভেন ডি আর একশো-চারশো কেনার জন্য, তাঁদের থেকেও দোষ বেশি সেই বিদেশি বন্ধুর, যাঁর ছবি দেখে আমি ভাবতাম, আহা আমিও এমন তুলব। আসলে আমি ২০১২ পর্যন্ত অ্যানালগ ক্যামেরায় ছবি তুলেছি। ডিজিটাল যুগে অনেক পরে ঢুকে আর তাল রাখতে পারিনি।


আমাদের হোটেল থেকে চোপতা ১৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু যাবার পথেই ককল্যাস ফিমেল কে পাওয়া গেল। আমিই স্পট করলাম, একেবারে গাড়ির গা ঘেঁষে পথের ধারেই চুপটি করে বসে ছিল। আমরা সন্তর্পনে নেমে অনেক ছবি নিয়েছি। তখনও সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েই বসে ছিল ঠায়। কিন্তু আগেই বলেছি, অত কাছের ছবিও আমার একেবারেই খারাপ। কারণ একে ভোর বেলা, তায় ঘন জঙ্গলে আলো একদমই ছিলনা।




যাই হোক, ফিমেল তো পাওয়া গেল। কিন্তু আসল তো মেল। যত পালকের কায়দা আর রঙের বাহার তো তাদেরই। একটা মেল পাওয়া যাবেনা? হঠাৎ দীনেশ গাড়ি থামিয়ে বলল। নেমে ওদিকে যান, একটা মেল বসে আছে। এবার গাড়ি থেকে নামাও খানিক মুশকিল। আগেই বলেছি, আসার দিন থেকে পেছনে বসলেই সবার সের দরে বমি হতে লেগেছে, তাই আমি কনফার্মড ব্যাক বেঞ্চার। এবার পেছনের দরজা খুলে ক্যামেরা হাতে লাফ দিয়ে নামাও সোজা নয়। লাফালাফি করাও বিপজ্জনক। বেশি আওয়াজে পাখি পালাবে।


তাই বাকিরা নেমে এগিয়ে গেছে অনেকটা। আমি সবার পেছনে। আমি দেখলাম, কয়েকটা মোটা মোটা গাছ, তার ওধারে চলে গেছে কৌশিক, অম্লান আর হিমাদ্রী। আমি তাদের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে আর ককল্যাস থাকবেনা। সে মানুষ দেখলেই পালায়। তার চেয়ে বিশ্বজিত গাছগুলোর এদিকে আছে। আমি সেখান থেকেই মারি। গেলামও দৌড়ে। কিন্তু দু তিনটে গাছের মাঝে সরু একটু ফাঁক। বিশ্বজিত সেই ফাঁক থেকেই তুলছে। তাকে তো আর সরিয়ে দিয়ে তুলতে পারিনা, তাই তার পাশ থেকে উঁকি দিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। দেখলাম ককল্যাস বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে উল্টোদিকে দেখছেন। মুখ না পেলে আর ছবি তুলে লাভ কী। শেষ মুহূর্তে একটা মাত্র ছবি নিতে পেরেছি, তাও ঠিক ফোকাসে নেই। এবারের মতো ককল্যাস ছাড়াই ফিরতে হবে, কী আর করা। যদিও নেগি বলল, ঠিক পেয়ে যাব, আরও তো দুদিন আছে। কিন্তু আমি জানতাম, কপালে ঢুঁ ঢুঁ।



একটা হোয়াইট কলারড ব্ল্যাকবার্ড পাওয়া গেল। এ ছবিটা পরিষ্কারই পেলাম।




একটা ফিমেল গ্রীন টেলড সানবার্ড দেখলাম। আমাদের কৌশিক মাইতির ফিমেলে অরুচি, সে মানুষ হোক বা পাখি। হাজার সামনে থাকলেও তুলবেই না। কিন্তু আমি নারী পুরুষে ভেদাভেদ করিনা, নিলাম তুলে।



এর পরে আর একটি ককল্যাস পেলাম বটে, কিন্তু তা এত দূরে ছিল, যে ছবির ৯০ ভাগই ক্রপ করতে হয়েছে। তাতে আবছা ভাবে চেনা যাচ্ছে বড়জোর। জানিনা আবার কবে আসতে পারব পাহাড়ে। ককল্যাস এর সঙ্গে দেখা হবে কবে বা কীভাবে।



(চলবে)



পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...