কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই
সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের মত মনে হবে। তবু
যাঁরা সমতলের মানুষ আর আমার আগের লেখাগুলো পড়েননি, তাঁদের জন্য থাক। এদের বলে
ক্রীপারস, মানে যারা কিছুর গা বেয়ে বেয়ে ওঠে। পাখিদের মধ্যে দু ধরণের ক্রীপার আছে,
ট্রী ক্রীপার আর ওয়ল ক্রীপার। ওয়ল ক্রীপার উঁচু পাঁচিলের গা বেয়ে ওঠে। পাহাড়ের
পাখি, পাথর বেয়েই ওঠে তবে দূর্গ জাতীয় মজবুত দেওয়াল পেলেও ওঠে। এদিকে ট্রী
ক্রীপাররা গাছ বেয়ে বেয়ে ওঠে। এরা গাছের বাকলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পোকামাকড় খায়।
পাখিদের মধ্যে কী অসাধারণ বৈচিত্র প্রকৃতির সব রকম খাদ্যভাণ্ডার থেকে তারা আলাদা
আলাদা রকম ভাবে প্রোটীন সংগ্রহ করে। এক জায়গায় বেশি প্রতিযোগিতা যাতে না হয়। কিন্তু
সেই চিরাচরিত কথা আবার বলতে হয়। মানুষ এই বৈচিত্র রাখতে দেবেনা। সব পাখি যে গভীর
জঙ্গলে থাকেনা, নানারকম গাছ, ঝোপঝাড়, ঘাস, কতকিছুর ওপর যে তারা নির্ভর, কে বোঝাবে,
কাকেই বা বোঝাবে। রাহস্থানের একটি মাত্র জায়গায় এখন ‘স্পটেড ট্রী ক্রীপার’ পাওয়া
যাচ্ছে, তাও এক জোড়া। আর কেউ আছে কিনা কেউ জানেনা। আবার সেই একজোড়ার ছবি তুলতে
সারা বিশ্বের আমার মত ক্যামেরাবাবুরা হাজির। তারা দৌড়ে মরছে এ গাছ থেকে ওগাছ।
বেচারি ওই জোড়া মেটিং করে বাচ্চাও তুলতে পারবেনা হয়ত। বেডরুমেই তো সিসিটিভি ২৪X৭ ।
যাই হোক , এটা স্পটেড নয়, ‘বার টেলড ট্রী ক্রীপার’। বার টেলড মানে, এদের
লেজে ‘বার’ অর্থাৎ সমান্তরাল দাগ থাকে। এটা অমন দুষ্প্রাপ্য নয়, খুব পাওয়া যায়।
পরেরটি আমাদের আলোচ্য, অর্থাৎ পাখি নয়, তবু সামনে এসে পড়ল যখন, এর নাম মাঞ্জ্যাক(muntjac) বা
বার্কিং ডিয়ার। এবার বার্ক অর্থাৎ কুকুরের মত আওয়াজ করে ভয় পেলে। তবে ঘেউ ঘেউ নয়,
একটা করে ডাক ছাড়ে, কিছু উঁচু জাতের কুকুরের মতো। এটি পুরুষ, শিঙ টিং বাহারি। এখানে কয়েকটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে, তারই একটির পাশ দিয়ে যাবার সময়ে এর দেখা পেলাম।
এবারে চলুন রডোডেন্ড্রন গাছ দেখা যাক, তবে দূর থেকে এখানে তেমন গা করেনা কেউ।
তবে বুরানশ স্কোয়াশ বানানোর জন্য বস্তা বস্তা তুলে নিয়ে যায়, যেগুলো হাতের নাগালে
আছে। যেগুলো নেই, সেগুলো দূর থেকে আলো করে রাখে চার দিক। এখানে শুধু রডোডেন্ড্রন
নয়, যত্ন করলে অনেক কিছু করা যেত, আর একটা সিকিমের ভার্সে বানানো যেত। কিন্তু কারও
গা নেই। যাই হোক, দূর থেকে ছবি দিচ্ছি, বড় করলে অনেক কালারফুল হতো, ইচ্ছে করেই
স্বাভাবিক রাখলাম।
সেই যে গ্রীন টেলড সানবার্ড দেখি্যেছিলাম একটু আগে, তার আসল চেহারাটা আলোর
বিপরীতে বোঝা যায়নি একদম। এখানে দেখুন তার আসল রঙ। পাখিটা খুব কালারফুল বটে। এই
প্রসঙ্গে, সানবার্ড বা মৌটুসি পাহাড়ের দিকে দারুণ রঙীন হয়, আরও একটা দেখাব এখানে
একটু পরে। আমাদের সমতলে যে দুটি পাওয়া যায়, তাদের এত রঙ দেননি ডারুইন কিংবা ঈশ্বর।
কিন্তু রঙীন ফুলে্র ক্যামোফ্ল্যাজ বলে নয়। যে যে ফুলে এরা বসে নিয়মিত, তাতে খানিক
ধন্দ জাগে, আসলে বিবর্তনটা কীভাবে হয়েছিল। যাক সে প্রণীবিদ পণ্ডিতদের ব্যাপার।
চলুন পাখিটা দেখা যাক।
দেখুন রডোডেন্ড্রন গাছে একাধিক বসেছে, সামনেরটি স্পষ্ট। ফুলের সঙ্গে গায়ের
রঙের কোনও মিল নেই। ইন ফ্যাক্ট এই বিশেষ পাখির মতো রঙের ফুল আমি এখনও দেখিনি। ছিল
হয়ত, নইলে বিবর্তন কেন হবে। মানুষের রাস্তা বানানোর চক্করে সেসব ফুল হয়ত হাপিস।
এ পাখিটার নাম রুফাস গরজেটেড ফ্লাইক্যাচার। এটি স্ত্রী পাখি। এদের গরজেট মানে
গলার ভাঁজে একটু রুফাস, মানে লালচে বাদামি রঙ থাকে। এটি স্ত্রী বলে সে রঙ খুব
আবছা, পুরুষ হলে একটু ঘন হতো। দু তিন দিন আগে, ফেসবুকে একটি ছবি দেখলাম, খুব
স্পষ্ট ছবি, প্রত্যেকটি রোম চেনা যাচ্ছে। মানুষ দেখলে তারিফ করবেনই। কিন্তু যা
গায়ের রঙ দেখা গেল সে ছবিতে, তা এর রঙ নয়। আমি আমার আমপাড়া ক্যামেরার শত অত্যাচার
মুখ বুজে সহ্য করি এই কারণে, যে রঙ সে দেয়, তা অবিকৃত।
এ পাখিই আলোয় দেখুন, হালকা রুফাস রঙের ছোঁয়া গলার ভাঁজে।
আমি আগে বোধহয় অনেকবার বলেছি ওয়ার্বলার গোত্রের ন্যূনাধিক ১০৩ রকম পাখি আছে
ভারতে। তারা অনেকে এত কাছাকাছি দেখতে, যে আইডেন্টিফাই করা একেবারে দুঃসাধ্য।
ফেসবুকে কিছু বার্ডিং গ্রুপ আছে। তাতে আছেন নানা পক্ষীবিদ ও আন্তর্জাতিক পণ্ডিত।
সবাই তাঁদের মত নিতে যান নিজে না পারলে। আমি কিন্তু সেই সব আন্তর্জাতিক মানুষকেও
ভুল আই ডি করতে দেখেছি ওয়ার্বলারের। তবে এদের মধ্যে কিছু আছে যারা সহজেই
আইডেন্টিফায়েবল। এটি তেমনই এক পাখি, এর নাম ‘অ্যাশি থ্রোটেড ওয়ার্বলার’, অর্থাৎ ছাই
রঙা গলা ওয়ালা ওয়ার্বলার।
এবার এক মজার জিনিস দেখিয়ে আজকের পর্ব শেষ করব। আমি আগে বেশ কবার বলেছি, আমার
ক্যামেরা ক্যাননের এবং মধ্যবিত্তের তুলনায় যথেষ্টই দামি। বডি আর লেন্স মিলিয়ে লাখ
আড়াই ছিল যতদূর মনে পড়ে। তা এ ক্যামেরা নীল আর হলুদ রঙ ফোকাসে অক্ষম, একথা অনেকবার
বলেছি। মানুষ শুনলে হাসেন, ক্যামেরা সার্ভিস সেন্টারের মানুষরা হাসেন। হাসি
স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি। একমাত্র ব্যাকবাটনে কাজ হয়, কিন্তু তাও এখন ডিফাঙ্কট।
নীচে দিচ্ছি পরপর ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার পুরুষ ও স্ত্রীর ছবি পরপর। ভার্ডিটার এত
সহজলভ্য কিন্তু পেলে সবাই তোলে। নিজের স্টকে হাজার দুয়েক থাকলেও।
দেখুন পুরুষ ফোকাসে নেই -
কিন্তু স্ত্রী শার্প ফোকাসে আছে।
এই রুফাস গরজেটেড ফ্লাইক্যাচার প্রসঙ্গে একটা গল্প বলব আগামি পর্বে। ছবিটা তখন
আর একবার দেব।
(চলবে)






































