Monday, 30 April 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৫





ককল্যাস koklass এর খোঁজে



কালকের ছবিটা সকলেই ঠিক বলেছেন। কিন্তু ফেয়ার প্লে হয় নাই। ছবিটা ওই অবস্থায় দেখতে হতো। এনলার্জ করে নয়। আসলে ওই অবস্থায় দেখেও বলে দেওয়া যায় কিন্তু খালি চোখে যা দেখেছি, তা দেখলে কারও সাধ্য ছিলনা। আমি জঙ্গলে গেলে এমন জিনিষ সংগ্রহে রাখি। আমার তাড়োবা ট্যুরে একটা চাইনিজ ড্র্যাগন পেয়েছিলাম। সেটা বেশ সমাদৃতও হয়েছিল পাঠক/দর্শক মহলে। যাক ছবিটা আবার দিচ্ছি। সব কটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমনটি দেখা গেছে। কেবল কান দুটো আবার ঠোঁট বলেও চালানো যায়, যদি মুখটা ওপরে করা আছে মনে হয়। সে ছবিটাই দিচ্ছি নীচে।



এদিন মোনাল দেখার পর আলো কমে গেছিল। খানিক মেঘলাও হয়ে গেছিল। আমরা হোটেল বা যাই বলা হোক, সেখানে ফিরে গেলাম। জায়গাটি লোকেশনের দিক থেকে যথেষ্টই ভাল। ঘরদোরও বেশ ভাল। শুধু এক ঘরে তিনজনের থাকা একটু চাপের। তা এক ঘরে বিশ্বজিত-হিমাদ্রী, আর এক ঘরে দুই ডাক্তার ও তৃতীয় ঘরে আমার ঠাঁই হলো। একটা কথা বলে নেওয়া হলো, যে এই ঘরটার জন্য কিন্তু পুরো ভাড়া দেওয়া হবেনা। যাই হোক অ্যাকোমোডেশন বেশ ভাল হলেও এখানে খাবারের দাম অস্বাভাবিক বেশি। আবার একই খাবার ভিন্ন দিনে ভিন্ন দামে এসেছে। সে সব ডিটেলে গিয়ে লাভ নেই। আসলে গাইডের সঙ্গে এই হোটেল ও আমাদের গাড়ির একটা বন্দোবস্ত ছিল। আমাদের পোথিবাসায় এক রাতই থাকার কথা। পরের দিন আমাদের চোপতায় শিফট করার কথা ছিল। শোনা গেল গাইড নাকি বলেছে, আমরা এখানে থাকি তাইও নাকি ও চায়। এমনিতে আমাদেরও যে খুব আপত্তি ছিল তা নয়। পরে বুঝেছি, এখানে থেকে লাভ বই লোকসান হয়নি। কেবল খাবারটা পরের দিকে যেমন নিচ্ছিল, প্রথম দেড়দিন যদি তাই নিত।

পরদিন খুব ভোরে আমরা বেরিয়েছি। সেদিনের টার্গেট ‘ককল্যাস ফেজ্যান্ট’। আসলে মোনাল মোনাল করে পাবলিক ক্ষেপে গেলেও এটাই মূল টার্গেট হওয়ার কথা ছিল। আমার নিজের তো ছিলই। ককল্যাস কে খুব ভাল ভাবে ক্যামেরায় তোলা বেশ কঠিন, কারণ, মানুষ দেখলেই সে প্রাণভয়ে দৌড়ে বা উড়ে পালায়। এর গায়ের রঙ একেবারেই মোনাল সুলভ উজ্জ্বল কিছু নয়। তবে ভাল করে ঠাওর করলে অন্তত আমার চোখে তো সে মোনালের চেয়ে কম কিছু নয়। আমি খুব করে মুখিয়ে ছিলাম ককল্যাসের জন্য। এদিকে আমার কিছু হ্যান্ডিক্যাপও ছিল। আমি কিছু লোকের কথায় এবং আমার এক বিদেশি ফেসবুক বন্ধুর ছবি দেখে ক্যাননের সে্ভেন ডি কিনেছিলাম। তার সঙ্গে ১০০-৪০০ লেন্সও সেই বিদেশি বন্ধুর দেখাদেখিই। কিন্তু কিছুদিন ব্যবহার করেই বুঝলাম এতে অনেক ডিফেক্ট। নেটে রিভিউ গুলো পড়ে দেখলাম সারা পৃথিবীর নামকরা ফোটোগ্রাফাররা বলছেন সেভেন ডি তে ৪০০-র বেশি আইএসও তে তুললেই ফেটে যায়। এদিকে আমার যত পরিচিত বেশির ভাগই নিকন ব্যবহার করেন। তাঁরা ৩২০০ তেও বেমালুম তুলে যাচ্ছেন। অথচ কেনার আগে আমার তখনকার পরিচিত সবাই বলেছিলেন এটা দারুণ ক্যামেরা। এখন অনেকেই বদলে নিতে বলছেন। কিন্তু দুম করে এক দেড় লাখ খরচ করাও বেশ চাপের। আমি তেমন বিত্তবান তো নই। এর ওপর আর এক অসুবিধে। আমার লেন্স চারশো। আমার সঙ্গের অনেকেই বা সকলেই ন্যূন্তম ৫০০, অনেকে ৬০০ দিয়ে তুলছেন। সে সব লেন্স কিনতেও আরও প্রায় সম পরিমান টাকা লাগে। তাই সে সব দেখে খানিক ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগি। আমায় যাঁরা উস্কেছিলেন সেভেন ডি আর একশো-চারশো কেনার জন্য, তাঁদের থেকেও দোষ বেশি সেই বিদেশি বন্ধুর, যাঁর ছবি দেখে আমি ভাবতাম, আহা আমিও এমন তুলব। আসলে আমি ২০১২ পর্যন্ত অ্যানালগ ক্যামেরায় ছবি তুলেছি। ডিজিটাল যুগে অনেক পরে ঢুকে আর তাল রাখতে পারিনি।


আমাদের হোটেল থেকে চোপতা ১৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু যাবার পথেই ককল্যাস ফিমেল কে পাওয়া গেল। আমিই স্পট করলাম, একেবারে গাড়ির গা ঘেঁষে পথের ধারেই চুপটি করে বসে ছিল। আমরা সন্তর্পনে নেমে অনেক ছবি নিয়েছি। তখনও সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েই বসে ছিল ঠায়। কিন্তু আগেই বলেছি, অত কাছের ছবিও আমার একেবারেই খারাপ। কারণ একে ভোর বেলা, তায় ঘন জঙ্গলে আলো একদমই ছিলনা।




যাই হোক, ফিমেল তো পাওয়া গেল। কিন্তু আসল তো মেল। যত পালকের কায়দা আর রঙের বাহার তো তাদেরই। একটা মেল পাওয়া যাবেনা? হঠাৎ দীনেশ গাড়ি থামিয়ে বলল। নেমে ওদিকে যান, একটা মেল বসে আছে। এবার গাড়ি থেকে নামাও খানিক মুশকিল। আগেই বলেছি, আসার দিন থেকে পেছনে বসলেই সবার সের দরে বমি হতে লেগেছে, তাই আমি কনফার্মড ব্যাক বেঞ্চার। এবার পেছনের দরজা খুলে ক্যামেরা হাতে লাফ দিয়ে নামাও সোজা নয়। লাফালাফি করাও বিপজ্জনক। বেশি আওয়াজে পাখি পালাবে।


তাই বাকিরা নেমে এগিয়ে গেছে অনেকটা। আমি সবার পেছনে। আমি দেখলাম, কয়েকটা মোটা মোটা গাছ, তার ওধারে চলে গেছে কৌশিক, অম্লান আর হিমাদ্রী। আমি তাদের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে আর ককল্যাস থাকবেনা। সে মানুষ দেখলেই পালায়। তার চেয়ে বিশ্বজিত গাছগুলোর এদিকে আছে। আমি সেখান থেকেই মারি। গেলামও দৌড়ে। কিন্তু দু তিনটে গাছের মাঝে সরু একটু ফাঁক। বিশ্বজিত সেই ফাঁক থেকেই তুলছে। তাকে তো আর সরিয়ে দিয়ে তুলতে পারিনা, তাই তার পাশ থেকে উঁকি দিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। দেখলাম ককল্যাস বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে উল্টোদিকে দেখছেন। মুখ না পেলে আর ছবি তুলে লাভ কী। শেষ মুহূর্তে একটা মাত্র ছবি নিতে পেরেছি, তাও ঠিক ফোকাসে নেই। এবারের মতো ককল্যাস ছাড়াই ফিরতে হবে, কী আর করা। যদিও নেগি বলল, ঠিক পেয়ে যাব, আরও তো দুদিন আছে। কিন্তু আমি জানতাম, কপালে ঢুঁ ঢুঁ।



একটা হোয়াইট কলারড ব্ল্যাকবার্ড পাওয়া গেল। এ ছবিটা পরিষ্কারই পেলাম।




একটা ফিমেল গ্রীন টেলড সানবার্ড দেখলাম। আমাদের কৌশিক মাইতির ফিমেলে অরুচি, সে মানুষ হোক বা পাখি। হাজার সামনে থাকলেও তুলবেই না। কিন্তু আমি নারী পুরুষে ভেদাভেদ করিনা, নিলাম তুলে।



এর পরে আর একটি ককল্যাস পেলাম বটে, কিন্তু তা এত দূরে ছিল, যে ছবির ৯০ ভাগই ক্রপ করতে হয়েছে। তাতে আবছা ভাবে চেনা যাচ্ছে বড়জোর। জানিনা আবার কবে আসতে পারব পাহাড়ে। ককল্যাস এর সঙ্গে দেখা হবে কবে বা কীভাবে।



(চলবে)



Sunday, 29 April 2018

পোথি পথিকরা ( The bird travellers) - ১৪







মোনা ডারলিং



খেয়াল করবেন, ‘ডার্লিং’ না লিখে ‘ডারলিং’ লেখা হলো। যাঁরা এযুগের মানুষ, তাঁরা এই পুরনো রসিকতাগুলো বুঝবেন না সম্ভবত, তাই ব্যাখ্যার প্রয়োজন। কয়েক দশক আগে, বোম্বের (আমি ডেলিবারেটলি ‘বলিউড’ শব্দটা লিখিনা, তবে ব্যঙ্গার্থে ‘টলিউড’ লিখি।) হিন্দী ছবিতে নানারকম ভিলেন রাজত্ব বা দাদাত্ব করতেন। আমি বলছি প্রি-অমরিশ পুরী এরার কথা। তখন প্রাণ, জীভন, রঞ্জিত, প্রেম চোপড়া, আদি অনেকেই ছিলেন। একজন ছিলেন অজিত। এই ভিলেনটি এতই বোকা বোকা ডায়ালগ বলতেন (হয়ত বলানোই হতো) যে সে সময় ‘অজিত জোকস’ চালু হয়ে গেছিল সারা প্রিন্ট মিডিয়া জুড়ে। তখন টেলিমিডিয়া ছিলনা। অজিত জোকস এতই পপিউলার হয়েছিল, যে স্কুল কলেজে ব্যাপক ছড়িয়েছিল। আর শেষমেশ যে কোনও জোকেই অজিতকে ঢুকিয়ে অজিত জোকস করে ফেলা হচ্ছিল। তা এই অজিতের এক সহকারী, তার নাম ‘রোবার্ট’( মানে রবার্ট আর কি) আর এক সহকারিনী, তার নাম ‘মোনা’। লাল চুল ওয়ালা অজিত মোনা কে ডাকতেন ‘মোনা ডারলিং’ বলে। এই কমিকাল ভিলেনি এত জনপ্রিয় হয়েছিল, যে অজিত থাকা মানে একসঙ্গে কমেডিয়ান আর ভিলেন পাওয়া। প্রোডিউসারদেরও হট প্রপার্টি।


তা বার্ডারদের হট প্রপার্টি হচ্ছে ‘মোনাল ডারলিং’। মোনাল মোনাল করে পাগল সবাই। আমি পাগল নই, কারণ মোনাল আমার পকেটে বেশ কিছু আছে। এটা হিমালয়ান মোনাল।  কপালে থাকলে আর  জীবদ্দশায় উত্তর পূর্বের রাজ্যে যেতে পারলে স্ক্লেটার্স মোনাল যদি পাই। যাই হোক পাখিবাজদের মুখে সব সময়েই শুনি মোনাল মোনাল। অথচ মোনাল যেখানে থাকে সেই একই এলাকায় আরও কিছু দুষ্প্রাপ্য ফেজ্যান্ট পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু সব চেয়ে বেশি নম্বর পায় এই ‘মোনাল’। কেন, তা আমি বুঝিনা। সব ফেজ্যান্টই সুন্দর। মোনালের গায়ে কাচপোকার মতো ফ্লুওরোসেন্ট রঙ আছে বটে, কিন্তু সেই যুক্তিতে ময়ূর কেন এত পপিউলার নয়? জঙ্গলে গেলে পাখিবাজদের ময়ূর নিয়ে তো এত আদিখ্যেতা করতে দেখিনা! সহজলভ্য বলে, নাকী?


যাই হোক আমাদের গাইডকে মানে দীনেশ নেগিকে আগেই বলে দেওয়া হয়েছে প্রায়রিটিতে মোনাল ওপরের দিকে। আর সে আমাদের নিয়ে চলেছে মোনাল অধিকৃত অঞ্চলে। পাহাড়ের গায়ে শুকনো হলদে ঘাস দেখেই বুঝলাম এসে গেছি মোনাল রাজ্যে, কারণ আমি প্রথম মোনাল তুলি মুন্সিয়ারিতে এমনই এক এলাকায়। তার পর থেকে যতবারই গেছি, সেখানেই পেয়েছি। তাই এখানেই পাওয়া যাবে বলে প্রত্যয়। তা আসতে না আসতেই চাপা স্বরে ওই, ওই, বলে হাঁক শুনে তাকাতে দেখি ওই যে, বাবু ঠিক হাজির। সেই এক ধরণের কালচে পাথর আর তাদের ফাঁকে শুকিয়ে যাওয়া হলদে ঘাস। আমার একবার মনে হয়, এ কি শুকনো ঘাসই? নাকি এর রঙই এরকম। কেননা যখনই আসি হলদেই তো দেখি। যাই হোক, মোনাল দেখুন।



শটটা ভাল হলো, বেশ পরিষ্কার। কিন্তু আমার সঙ্গীদের মন ভরেনি, তারা আরও কাছ থেকে চায়। শুধু তাই নয়, গাইড দীনেশ বলেছে, যে এর পর এমন ছবি দেব, যাতে আপনারা এসব ছবি ক্যামেরা থেকে ডিলিট করতে বাধ্য হন। তা জনগন তাতে খুবই উৎসাহিত, উত্তেজিতও। আমরা ছিলাম একটা বাঁকের মুখে, পথটা পাহাড়এর কোল ঘুরে গোল হয়ে এদিকে চলে এসেছে। আমরাও এলাম। আমাদের বাঁদিকে খাদ। কিন্তু খুব গভীর না, এই চল্লিশ পঞ্চাশ ফীট হবে, কিছুটা বাটির মতো। সেখানে কয়েকটা মাদি মোনাল ঘুরছিল। আমি  ছবি নিলামও মনে হলো। কিন্তু এখন আর পাচ্ছিনা। হয়ত ডিলিট করেই ফেলেছি ভুলে। যাই হোক একটি মোনাল নীচে পেলাম, কিন্তু সতর্ক না থাকায় তার ফ্লাইট শটটি পেলাম না। সেই পেলে অসাধারণ সুন্দর ছবি হতো।



এবার আমরা দুজন, আমি আর বিশ্বজিত এদিকে চলে এসেছি। বাকিরা ওদিকে রয়েই গেছে। দীনেশ পাগলের মতো হাত নেড়ে ওদের বলছে পিছিয়ে যেতে। কারণ এই মোনাল ওদিকে রাস্তা পেরিয়ে যাবেই। কিন্তু কৌশিক মাইতি পেছোতে রাজি নয়। এত হাতের সামনে পেয়েও ছেড়ে দেব? বলে সে তড়বড়িয়ে গেল তুলতে। মোনালটা উঠছিল, কঁক কঁক করে উড়ে পালাল। দীনেশ বলল, ও আবার আসবে। মিনিট কুড়ি দাঁড়াতে হবে। তা আমার বন্ধুরা কুঁজো হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। এলও সে। তারা ছবিও নিল। আমি খানিক তফাতেই থাকলাম। আমার কিছুটা দূরের ছবিই ভাল লাগে। তাছাড়া বড় পাখি তো, ক্রপ করেও যথেষ্ট ডিটেল পাওয়া যায়।



বীপরিত দিকে এক ঝর্ণার ছবি নিলাম দাঁড়িয়েই। অম্লান যেমন বলেছিল, তেমন শাটার ঢিলে করে কাসকেড নিলে হতো। কিন্তু তখন মনে ছিলনা।



এর পর পেলাম এক পাহাড়ি ফুল, পাথরের খাঁজে হয়ে আছে। অবহেলায় পড়ে থাকা এই সৌন্দর্যই টানে আমাকে। বাহারি টবের ফুলকে টেক্কা দিতে পারে যে কোনও স্পর্ধায়।



একটু বড় করে আবার।



 আসুন একটু শেষের কবিতা পড়ি

প্রভাত বেলায় হেলা ভরে করে অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ                               উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ

পাহাড়ে আসবেন, রডোডেনড্রন দেখবেন না, তাও কি হয়? স্থানীয় ভাষায় ‘বুরান্শ‌’। আবার সিকিমে বলে ‘গুরাশ’।



আচ্ছা এবার পাঠকগণকে একটা ধাঁধা দিই - 
গাছের গুঁড়ি বেয়ে যে জন্তুটি উঠছে, তার নাম বলুন। বলতে পারলে প্রাইজ আছে।
উত্তর পরের পর্বে।





(চলবে)



Friday, 27 April 2018

পোথি পথিকরা - ১৩


দা বার্ড ট্র্যাভেলার্স



এই যে বারোখানা এপিসোড বা পর্ব লিখে ফেললাম ‘পোথি-পথিকরা’ বলে, ব্লগের নামও ‘পোথি পথিক’। তা এই শব্দটির অর্থ কী? ‘পোথি’? এতদিন অর্থহীন মনে হচ্ছিল অনুপ্রাসটি। এখন সময় হয়েছে বলার।


ওরা ফিরে এসেছে দেওরিয়াতাল থেকে। বিশেষ কিছু উল্লসিত হওয়ার মতো পায়নি। আবার একেবারে খালি হাতেও ফেরেনি। এমনটাই হয়। একবার বিপিনের চাপে পড়ে লাটপাঞ্চার গেছিলাম বর্ষাকালে। তখন তো পাখি পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। বিপিন, মেজদাদের ধারণা ছিল পাহাড় মানেই পাখি। যাই হোক, কিছুই পাইনি, কিচ্ছুনা ওখানে। আমাদের রিসর্টের সামনে কয়েকটা রাসেট স্প্যারো ঘুরছিল শুধু। তবে আমরা ভারতের বিরলতম প্রাণী এসিয়ান স্যালাম্যান্ডার দেখে এলাম অহলদারা গিয়ে। অন্য সময়ে গেলে কিছুতেই হতোনা। কিন্তু সে তো পাখি নয়। পাখির কথা বলতে মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে শীতে গেলে কত যে পাখির মেলা কী বলব। বর্ষাকালে তো কিচ্ছু নেই, কাকও না। কিন্তু আমি পেয়ে গেলাম একজোড়া ‘পেল ব্লু ফ্লাইক্যাচার’। যা ইহজীবনে অন্যত্র পাইনি।

তাই যারা কষ্ট করে দেওরিয়াতাল উঠল, তারাও পেয়েছে কিছু না কিছু তো বটেই। হয়ত যেমনটি আশা করে গেছিল, তা হয়নি। যাই হোক আমার ‘সেরিন’ দর্শনে বাকিরা খুবই উল্লসিত। তারাও গেল হৈ হৈ করে, কিন্তু ‘তোমার দেখা নাইরে, তোমার দেখা নাই’। এবার আমাদের যেতে হবে এ জায়গা ছেড়ে। আমরা যাব সাত কিলোমিটার দূরে একটা জায়গায়, যার নাম ‘পোথিবাসা’। কী অর্থ এই নামের? পোথিবাসা মানে, ‘পাখির বাসা’। এই বাসা শব্দটি বাংলা। কিন্তু বাংলা অনেক শব্দই গাঢ়ওয়ালে ব্যবহৃত হয় তা আগেই বলেছি। কিছু বঙ্গযোগ ছিলও। সুন্দরলাল বহুগুণার কথাও লিখেছি আগে। যাই হোক, 'বাসা'-র মানে বাসা হলেও ‘পোথি’ মানে পাখি। আর পোথি-পথিক শব্দবন্ধের আমার কাছে মানে হলো, ‘দা বার্ড ট্র্যাভেলার্স’। আমার ব্লগের হেডিং কিছুদিনের মধ্যেই একটু রঙিন হবে। আর ইংরিজিতে নীচে থাকবে ও কথার অর্থ।


আলাপ হলো আমাদের গাইড, দীনেশ নেগির সঙ্গে। এই চোপতাতে খুব নামকরা গাইড হচ্ছেন ইয়শওয়ন্ত(যশোবন্ত) নেগি। কিন্তু তেনার খুব পা মোটা হয়েছে আজকাল। তাঁকে নাকি কনট্যাক্ট করা হয়েছিল, তিনি নাকি সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর কোনও ‘ডেট’ নেই। সুন্দরী কলগার্লরা এমন বলে থাকেন শুনেছি। যাই হোক, হোয়াটেভার। এদিকে এই নেগি বাবুর একটা রিসর্ট ছিল, উঁচুতে কোথাও। আমার এ অঞ্চলের টোপোগ্রাফি খুব একটা রপ্ত নয়। সত্যি কথা বলতে কি কোনও অঞ্চলেরই নয়। যে অঞ্চলে বহুবার গেছি, সেখানেও আমার রাস্তা গুলোয়। তা সেই রিসর্ট নাকি পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে সেই যেবার কেদারে সাংঘাতিক হড়পা বানে হাজার দশেক   প্রাণ  হারিয়েছিলেন, সেই ঘটনায়।


যে মানুষগুলো মারা গেলেন, এবং যে পরিবারে কিছু সারভাইভিং সদস্য বেঁচে রইলেন, তাঁদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি নিয়েই বলছি, এমনটা দরকার ছিল। বারো বছরের নীচের মেয়েকে রেপ করলে নাহয় ফাঁসি দিচ্ছ। প্রকৃতি, সে বারোই হোক বা বিরানব্বই, কেউ তো ছাড়ছনা। যে গাছ কেটে বাড়ি বানাচ্ছ, সেও রেপিস্ট, আর যে পাহাড়ের ‘সৌন্দর্য’ উপভোগ করতে করতে অমুক ভাজার টেট্রাপ্যাক পথের ধারে ফেলে আসছ, সেও। মরো, ডাই। ইউ শুড।


তা যাই হোক, সেই বড় নেগির রিসর্ট ধ্বংস হয়েছে। তাঁর নাকি সময়ও নেই, তাই এবার তেনার ভাইপো ছোট নেগি, নাম দীনেশ। এমনি ছেলে ভালই, তবে তারা উচ্চ ঘর, কংসরাজের বংশধর। মালটি সেয়ানা অতি, এবং ধান্ধাবাজ। তবু আমাদের কিছু কিছু সদস্যের দেখলাম তার প্রতি গভীর প্রেম। তা থাক, মেরা কেয়া। এর কথা পরে বলছি, এখন চলুন পোথিবাসা যেতে যেতে এই ছোটনেগি কীভাবে ‘পোথিকৃত’ হলো, তাই দেখা যাক।



আমাদের যাত্রাপথের প্রথম পাখি, ঠিক প্রথম নয়, দ্বিতীয়, কারণ প্রথমটিকে একটু আগেই দেখিয়েছি, হলো ‘গ্রে হূডেড ওয়ার্বলার’। আমার লেখা যাঁরা আগেই পড়তেন, তাঁরা জানেন, আমি বলি, এমনিতে ওয়ার্বলার আইডেন্টিফাই করা খুবই দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু এই পাখিটি খুব সহজেই আইডেন্টিফায়েবল। আবার অন্য কথা হচ্ছে, আগে বলেছি ভার্ডিটার কয়েকশো থাকলেও কেউ ছাড়েনা। এও তাই। সামনে পেলে লোকে ছবি তুলবেই। তার প্রধান কারণ হচ্ছে খালি চোখে এর হলুদ রঙের পেট দেখে চট করে বোঝা যায়না এ গ্রে হূডেড নাকি ইয়েলো বেলিড। তাই আগে মেরে দাও, পরে এনলার্জ করে দেখ। তা এবার দেখা গেল ইনি বাড়ি তৈরির সরঞ্জাম যোগাড় করছেন। মানে সুখবর। যদি না খারাপ কিছু ঘটে, আমরা আরও কয়েকটি গ্রে হূডেড পেতে চলেছি। আমরা মানে, পৃথিবীবাসী।


এর পরের ছবিতে আছেন ‘অ্যাশি ড্রঙ্গো’। ফিঙে পাখিকে ইংরিজিতে বলে ‘ড্রঙ্গো’ আর হিন্দীতে ‘কোতওয়াল’। তবে এই হিন্দী নামটা এখন বাতিলের জায়গায় এসে গেছে। কেন, তা অন্য প্রসঙ্গ, অন্য জায়গায় আলোচ্য। সাধারণত আমরা যে ফিঙেকে গ্রামাঞ্চলে তারের ওপর বসে থাকতে দেখি এবং যার ডাক থেকে এই ‘ফিঙে’ নামের উৎপত্তি, তারা ছাড়াও অনেক রকমের ফিঙে আছে এবং তাদের বেশির ভাগকে আমাদের বঙ্গভূমেই পাওয়া যায়, বাকি ভারতে না হলেও। এই ফিঙের নাম ‘অ্যাশি ডঙ্গো’, যদিও খালি চোখে রঙের তফাত সাধারণ মানুষ নাও ধরতে পারেন।



আর খানিক এগিয়ে যাকে পাওয়া গেল, সেও কুমায়ুন গাঢ়ওয়াল অঞ্চলে খুবই সহজলভ্য পাখি। আসলে গোটা হমালয় জুড়েই তার বাস আর উত্তর পূর্বের কিছুটা। এর নাম ‘ফায়ার ব্রেস্টেড ফ্লাওয়ারপেকার’। আমাদের বাংলায় সানবার্ডকে বলা হয় ‘মৌটুসি’ আর এর নাম ‘মৌচুষি’। তবে মৌচুষি অনেক রকম হয়। এই ফায়ার ব্রেস্টেড, মানে আগুন-বুকো, বাংলার পাখি নয়।



এর পরে যাকে পাওয়া গেল, সে পাখিটি খুবই সুন্দর, তবে ছবিটি সুন্দর হলোনা। সামনে একটা ডাল চলে এল। আগে নামটি বলি, এর নাম ‘ব্ল্যাক লোরড টিট’। খুব কাছাকাছি দেখতে আরও দুটি ‘টিট’ গোত্রের পাখি আছে। যাই হোক ছবিটা খুব কাছে পেয়েছিলাম। ডালটা সব্বোনাশ করল। আচ্ছা দেখে নিন, বলছি –



এই ডালটা সরানো যেত। এই দেখুন এখানে ডাল ছিল সামনে, আমি পেছনে নিয়ে গেছি। আগেরটাও যদি তাই করতাম, ছবিটা কী সুন্দর দাঁড়িয়ে যেত। তবে আমি অন প্রিন্সিপল এমন কাজ পরিনা পারতপক্ষে। এই অন্যায় আমি তখনই করি, যখন খুবই দুর্লভ পাখি পেয়েছি, যাকে ইহজীবনে আর নাও পেতে পারি, এমন সিটুয়েশন হয়।





এবার আমরা পোথিবাসা-তে আমাদের হোটেল বা রিসর্টে মালপত্র জমা করে বেরিয়ে পড়লাম আরও টারগেটেড কিছু পাখির খোজে। সকলেরই মূল চাহিদা ‘মোনাল’ পাখির, আসল নাম ‘হিমালয়ান মোনাল’। আমাদের সাহেব প্রভুদের হাতে পড়ে পাখিদের নাম প্রায়শই বদল হয়। তখন পুরনো নাম লিখলে আবার সাহেব চাটা কিছু ‘পক্ষীবিদ’ সাত তাড়াতাড়ি নতুন নাম বলে বিদ্যে জাহির করেন। আমি কিন্তু ডেলিবারেটলি, বা ইচ্ছাকৃত ভাবেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরনো নামই লিখি। এ পাখির আগে নাম ছিল ‘মোনাল ফেজ্যান্ট’। এবং খুব সহজ যুক্তিতে এটাই ঠিক নাম ছিল। বেসিকালি এটা ফেজ্যান্ট পাখিই।

যাই হোক আমার তেমন একটা মারাত্মক উৎসাহ ছিলনা, কারণ আমার কাছে মোনালের বেশ কিছু ছবি আছে। তবে পাখিটা দেখতে সুন্দর, কাচপোকার মতো উজ্জ্বল ফ্লুওরোসেন্ট রঙ। পেলে তো তুলবই।

একটা ঝর্ণা পেয়েছিলাম পথে। অম্লান বলল শাটার স্পীড খুব ধীর করে তুলতে, তাতে ওই কাসকেডিং এফেক্টটা খুব ভাল করে বোঝা যায়। আমি তুললামও। কিন্তু অনেকগুলো ধারাকে তুলতে পারলে তবে সেটা হতো। আমার যেহেতু জুম লেন্স ছাড়া কিছু নেই সঙ্গে, তাই দূর থেকে ছবি নিয়ে তাতে বহুধারা তোলা গেলনা।




(চলবে)




পোথি পথিকরা - ১২




সারিগ্রামের স্বরগ্রাম




আবার ফিরে যাই সেই দ্বিতীয়বার সারিগাঁওয়ের রিসর্ট থেকে বেরোবার গল্পে। আগেই বললাম, এক কাপ চায়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু বীরভদ্র সিং নেগির কোনও পাত্তা নেই, তার স্ত্রীরও না। সবই তালাবন্ধ, এমনকি তার দোকানও। তখন ভাবলাম আবার সেই লাফিং থ্রাশের ডেরায় একবার গিয়ে দেখি। আগেরবার যখন গেছিলাম, বাইরে সকালের আলো ফুটলেও ওই জায়গাটা একটা খাদের ধারে, তার ওপর বাঁকের মুখে। ওপাশে আবার খাড়া পাহাড়। তাই রীতিমতো অন্ধকার ছিল। এখন একটু আলো হয়ত ফুটেছে। চেস্টনাট ক্রাউনড লাফিং থ্রাশের যা ছবি আমার আছে, সবকটাই বেশ কম লাইটে তোলা। এবার যদি একটা ভাল স্ন্যাপ পাই।

আমি গিয়ে ওর বাসার পাশে ঘুরঘুর করছি, উঁকিঝুঁকিও মারছি ঝোপের গভীরে। যদি বাবুর দর্শন পাওয়া যায়। হঠাৎ ঝোপের নীচের অন্ধকার থেকে উঠে এল এক পাখি, যাকে আগে উড়ন্ত অবস্থায় দেখিয়েছি, কিন্তু নাম বলিনি। কেউ কেউ, যাঁরা চেনেন সে পাখিকে, নিজেরাই আইডেন্টিফাই করেছেন দেখলাম কমেন্টে। এই পাখিকে নিয়ে আমার দুঃখের শেষ ছিলনা। আমি আগে একবার বলেছি, আমার ক্যানন ক্যামেরা গভীর নীল রঙ ফোকাসে অসমর্থ। লোকে শুনলে হাসবে। এই কোম্পানির নিজেদের সারভিস সেন্টারে গিয়ে বহু হাজার টাকার বিনিময়ে সারভিস করিয়েছি। তাঁরাও হয়ত হেসেছেন, কিন্তু মুখে বলেছেন, এমন কি কখনও হয়? নিশ্চয় আপনারই কোনও ভুল হয়েছে।


ব্যাপার হচ্ছে আমি সিরিয়াস ফোটোগ্রাফি, মানে এসএলআর ক্যামেরায় ছবি তুলছি ১৯৮০ সাল থেকে। এখন যাঁরা আমাকে জ্ঞান দিচ্ছেন, অনেকে জন্মাননি তখন। তাই এসব কথা শুনলে রাগ হবার কথা, হয়ও। এই তো কিছুদিন আগে। লাটপাঞ্চারে গেছি। আগেই বলেছি ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার খুব, খুব সহজলভ্য পাখি হলেও সকলেই ছবি তোলে, তাকে পেলেই। হয়ত তার কাছে কয়েক শো ছবি আছে, তাও তোলে। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে, মোটামুটি পনের বিশ ফীট দূরে একটা উঁচু খুঁটির মাথায় ভার্ডিটারবাবু মেজাজে বসে আছেন। বেশ আলো টালোও আছে চারদিকে। বিপিন আর আমি পাশাপাশি, ওর হাই এন্ড নিকন, আমার আমপাড়া ক্যানন। বিপিন গোটা চার ছয় শট নিল, আমি কমপক্ষে পঁচিশটা। দশ মিনিট ধরে খ্যাচ, খ্যাচ, খ্যাচ, মেরেই যাচ্ছি, বার্স্ট মোডে নয়, সিঙ্গল সিঙ্গল। শেষে পাখি পোজ দিয়ে দিয়ে বিরক্ত হয়ে উড়ে গেল। আমি মনিটরে দেখলাম একটাও ছবি হয়নি, একটাও না।


যাক ভার্ডিটার গেল, এই লাটপাঞ্চারেই, নার্সারিতে নেমেছি একবার। দীপঙ্কর স্পট করল, একটা স্মল নিলটাভা একটা শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের ঝাড়ের ওপর বসে। সবাই নিচ্ছে খচাখচ, আমিও নিলাম, বাড়ি এসে পিপি করতে গিয়ে দেখি, চেনা যাচ্ছে বটে, কিন্তু একে ছবি বলেনা। সিকিমের হী গাঁওয়ে, দীপঙ্করের সঙ্গে গেছি। দশ হাত তফাতে সে বসে। আমি ছসাতটা নিলাম, এবার বার্স্ট মোডে, নাঃ হলনা। চীৎকার করে গাইতে ইচ্ছে করে, ‘ইয়ে নীল রঙ, কব মুঝে ছোড়েগা -’।


আজ নীচ থেকে কে উঠে এল? সেই ‘স্মল নীলটাভা’। কাছে, বড্ড কাছে। আমি ক্যামেরা তুললাম। জানি হবেনা। কিন্তু মন বলল, এত কাছে তো, এবার হয়ে যাবে, দেখ, ঠিক হবে। হ্যাঁ, মাশাআল্লা, হয়ে গেল। শুধু হয়ে গেল না দ্দারুণ হল, দ্দারুণ। এত কাছে বলেই বোধহয়। এই নিন, স্মল নিলটাভা। মজার কথা হচ্ছে, নিলটাভা মানে নীলচে আভা হলেও নামটা ইংরিজি। আর ইংরিজিতে নীল হচ্ছে ব্লু।



ইত্যবসরে, ‘চেস্টনাট ক্রাউনড লাফিং থ্রাশ’ বাবুও বেরিয়েছেন। সে ছবি আর দেখাচ্ছিনা, কারণ এর পরে যেখানে গিয়ে উঠলাম, সেখানে ঘরের পেছনেই এত ভাল ছবি পেয়েছি, যে ইনি এখন থাকুন ঝোপের গভীরেই।

পথে যেতে আর এক লাফিং থ্রাশ পাওয়া গেল, ‘স্ট্রীকড লাফিং থ্রাশ’। এ বেচারির ছবি কেউ তোলেনা, কী দুঃখ। অবশ্য ফোটোগ্রাফারের দোষ না। এই পাখি যদিও কাক শালিখের মত আধা গৃহপালিত পাখি নয়, তবু এরা ভয়ডর বিহীন। মানুষের খুব কাছে মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তা এর ছবি কেউ তোলেনা কেন? তার কারণ একে তো খুবই সহজলভ্য। তার ওপর এ ব্যাটাচ্ছেলে কেবল অন্ধকার ছায়াচ্ছন্ন জায়গায় টুকুস টুকুস করে লাফিয়ে বেড়াবে। কিছুতেই আলোয় আসবেনা। আমাদের গত কুমায়ুন ট্যুরে সোমনাথ বলল, দাদা যদি একে কোনওদিন রোদ্দুরে পেয়ে যান, দেখবেন রঙের কী বাহার। ব্যাটা সারাক্ষণ ছায়ায় ছায়ায় ঘোরে বলে বোঝা যায়না।

তা আজ এক ব্যাটাকে পেলাম। রোদ্দুরে না হলেও আলোয়। পাওয়া মাত্র নিয়ে নিয়েছি। ভাল করে দেখলে বোঝা যায়, মোটেই কুদর্শন নয় পাখিটা। শুধু অন্ধকারে থাকে বলেই আমল পায়না ছবি তুলিয়েদের কাছে।



খানিক এগোতেই পাওয়া গেল। ‘পিঙ্ক ব্রাওড রোজফিঞ্চ’ পুরুষটিকে। এর ছবি আগেও দেখিয়েছি। কিন্তু এত কাছ থেকে, এত ভাল ছবি বোধহয় আর হয়না। এরা রিসর্টের খুব কাছেই শস্যক্ষেতের মাঝে একটা কাঁটা গাছে এসে বসেছিল। অকুতোভয়, আমি যখন ছবি নিচ্ছি, ভয় পাওয়া বা উড়ে যাওয়ার কোনও লক্ষণই ছিলনা। বার কতক ঘাড় ঘুরিয়ে ‘হ্যালো’ বলেও দিল আমাকে।



পুরুষ থাকলে নারীই না বাদ থাকে কেন, তাদেরও পেয়ে গেলাম, ওই কাছেই, সমদূরত্বে।



এক বেচারা কমন রোজফিঞ্চ পুরুষও বসে ছিল গা ঢাকা দিয়ে, একটু আড়ালে। এই সব নামকরা বিশেষজ্ঞদের সামনে এ আর সামনে আসে? লজ্জাই পাচ্ছিল মনে হয়।



আর একটু এগিয়ে যাকে পাওয়া গেল, তিনি আমাদের গেরস্ত চড়াইবাবু নন, এঁর নাম 'রাসেট স্প্যারো'। একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন গায়ের রঙে কত তফাত। ইনি পুরুষ।



খানিক তফাতে এঁর গিন্নিকেও পাওয়া গেল। তিনি আমাদের ঘরোয়া চড়াই গিন্নির চেয়ে রঙে রূপে আলাদা।



সারি গাঁও তে আমরা বার তিনেক এসেছি। এমনিতে আসার কথা ছিলনা। কিন্তু সেই যে ‘রেড ফ্রন্টেড সেরিন’ আমি আবিষ্কার করলাম, তাকে ক্যামেরাবন্দি করতেই আমাদের দলের অন্যরা দফায় দফায় এসেছে। আমিও এসেছি তাদের সঙ্গে। কেবলমাত্র সেরিন ছাড়া আর যে সব পাখি পরেও পেয়েছি তাদেরও এখানেই দিয়ে দিচ্ছি। কেবল সেরিনের গল্পে আসব আর একবার।

আমার অনেক দিনের টার্গেট ছিল ‘ব্ল্যাক চিনড ব্যাবলার’। আগে পাইনি তা নয়, কিন্তু খুব কাছে, নানা কৌণিক অবস্থানে এমনটি আর পাইনি। খুব ভুতুড়ে পাখি, সামনে থেকে দেখলে। একদম মুখোমুখি ছবিও পেয়েছি, কিন্তু ভাল ফোকাসে ছিলনা। তাই এটা।



এর পরেরটায় ক্লোজ আপ, রডোডেনড্রনের মধু খেয়ে তখনও ঠোঁটে লেগে আছে।



সেই যে অ্যাংরি বার্ড দেখিয়েছিলাম, তার নাম আগেও বলেছি, ব্ল্যাক থ্রোটেড টিট। আসলে মুখের আর গলার পালকের রঙ এমনই, খুব রাগি রাগি দেখতে লাগে সামনে থেকে। আসলে খুবই সুন্দর পাখি।



সব শেষে আর এক এমন পাখি, যার ছবিও ফোটোগ্রাফাররা তোলেন না। কারণ পাহাড়ে এ আর এক সহজলভ্য পাখি। কত তুলবেন! তবে এ ছবিতে দৃশ্যপট, বিন্যাস ও ফ্রেমিং এমনই, যে নিতেই হলো। এর নাম নিশ্চয় জানেন, ‘রুফাস সিবিয়া’।



 (চলবে)

Thursday, 26 April 2018

পোথি পথিকরা - ১১





আরও কিছু সারিগ্রাম


(যাঁরা নতুন ব্লগে লেখা পড়ছেন, ছবিগুলোকে ক্লিক করলেই বড় করে দেখা যাবে)

সারিগাঁওতে মূল রাস্তা কিন্তু একটিই। তাই ঘুরে বেড়ানো তেমন ভাবে সম্ভব না। যদি কেউ ওপরে না ওঠেন, মানে দেওরিয়াতাল না যান বা অন্য কোনও পাহাড়ি পথ বেয়ে না ওঠেন বা না নামেন। তবে দিন দুই ভাল লাগবে সারিগ্রাম, বড়জোর তিন। কিন্তু তার মধ্যে আপনাকে শুষে নিতে হবে প্রকৃতির নানা সম্পদ। এখানে যা আছে, তা অন্যত্রও থাকতে পারে, তবে এমন ভাবে নয়।

ধরা যাক এই ফুলটি, পাহাড়ের সর্বত্রই একে দেখা যায়, ইতি উতি ঘাসপাতার মাঝখান থেকে উঁকি মারে। কিন্তু এই ভাবে ঘন ঝাড় হয়ে পাহাড়ের গায়ে ফুটে থাকতে আমি অন্তত কোথাও দেখিনি। দেখাটা অসম্ভব তা বলছিনা, আমি দেখিনি, এই পর্যন্তই। নীচে যে ছবি দিচ্ছি, তা বিশাল ঝাড়ের খণ্ডিত অংশের চিত্রমাত্র। পুরো ঝাড়টা অনেক অনেক বড়।



এই আর একটি ফুল বা ফুলের মতই কিছু। একে কিন্তু আমাদের বাংলার পর্বতাঞ্চলেও দেখেছি দেওয়ালের গায়ে ফুটে থাকতে। এই উদ্ভিদ এমনই আগাছা, যা মাটিতে নয়, দেওয়ালের গায়ে জন্মায়। তবে অন্যত্র যা দেখেছি, তা শুকনো, রুগ্ন, দুর্বল কিছু শ্যাওলা জাতীয় আগাছা। তা দেখে ছবি তোলবার সাধ হয়নি কখনও। এখানে তার রূপের বাহার দেখে প্রথমেই আনছি পুরো ঝাড়টি -



ও পরে খণ্ডিত অংশ দেখাই খানিক।



এবার সামনে আসছে ‘অ্যাংরি বার্ড’। পাহাড় মানেই কিছু ‘টিট’ গোত্রের পাখি। আমাদের বাংলা ও সিকিমে, যত্র তত্র যেমন ‘গ্রীন ব্যাকড টিট’ দেখা যায়, ভারতের প্রায় তিন চতুর্থাংশে যেমন ‘সিনেরাস টিট’ দেখা যায়, এই কুমায়ুন গাঢ়ওয়ালে তেমনই ব্ল্যাক থ্রোটেড টিট আর ‘ব্ল্যাক লোরড টিট’এর ছড়াছড়ি। সারিগ্রামে দেখি তারা চড়াইয়ের মত ঘুরে বেড়ায়। পাখিদের ছবির সঙ্গে এর ছবি আবার আসবে। কিন্তু এখন দেখুন, কেন তাকে ‘অ্যাংরি বার্ড’ নাম দিয়েছি আমি।





সারিগাঁওতে ঘর গেরস্থালির মাঝে মাঝেই ছোট ছোট চাষের ক্ষেত, ফলানো হয় ধান ও যব। সবুজ লকলকে গাছগুলোকে দেখলে আমাদেরই লোভ হয়, পাখির তো হবেই।



তার অপেক্ষা করে কবে এ গাছ ফসলে নুয়ে পড়বে। তখন তারা নেমে আসবে ঝাঁকে ঝাঁকে।



শুধু কি শস্যদানা? এখানে গাছে ফলে থাকে ‘লাইম’ বা মিষ্টি লেবু।



আর থাকে টুসটুসে কমলা। তবে তা খেতে কেমন তা আমি বলতে পারিনে।



এখানে রডোডেনড্রন ফুলের মধু খেতেও জুটে যায় অনেক পাখি।



আর একটি আগাছা দেখিয়ে আজকের পর্বে ইতি টানি। এও এক আগাছার ফুল, যাকে সব পাহাড়েই দেখা যায় পথের ধারে ফুটে থাকতে, তবে এমন বিপুল সংখ্যায় নয়।



আমরা পরেরদিন দেখব সারিগাঁওয়ের পাখিদের আরও ভাল করে।

(চলবে)




পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...