পোথি পথিকরা – ৪
জানিনা
নোট কবে ফেরত পাব। আপাতত
স্টেটাসেই চলুক। কিন্তু
মন খুঁতখুঁতুনি থাকছেই। নোট
আর স্টেটাসে আকাশ পাতাল ফারাক। ব্লগ
খোলার চেষ্টা চলছে।
দেখি তাতেই লিখব এর
পরে।
মানব বাবুরা নেমে গেছেন
বেরিলিতে। আমাদের
হরিদ্বার আসতে ঢের দেরি। আসলে
ট্রেন এমনিতেই ১১ ঘন্টা লেট,
তায় মাঝপথে যোগ হয়েছে
আরও ঘন্টা ছয়েক।
মনে মনে ভাবছি একদিকে
ভালই হলো, আমাদের হরিদ্বার
পৌঁছনোর কথা আগের দিন
দুপুর বা বিকেল নাগাদ। কিছু
লেট থাকেই এ ট্রেন,
তাতেও সন্ধ্যা। তখন
তো যাওয়া যায়না, তাই
একটা মোটামুটি ভদ্রস্থ হোটেলে ওঠা।
সে খরচাটা বেঁচে গেল। এবার
পৌঁছনোর কথা ভোর তিনটেয়। গাড়ি
আগের দিন থেকেই দাঁড়িয়ে
আছে আমাদের জন্য।
কিন্তু হতচ্ছাড়া ট্রেন পৌঁছল আটটা
নাগাদ। বৃষ্টি
পড়ছিল, কয়েকজনের মুখ ভার।
আমি আর কৌশিক মাইতি
ট্রেনেই আলোচনা সেরে নিয়েছি
যে ফোরকাস্ট দেখেই ট্রেনে উঠেছি
আমরা। আমাদের
ওপরে থাকার কদিনই বৃষ্টি
হবার কথা। তার
মানে নো বার্ডিং।
তাতে কোনও অসুবিধে নেই। কান্নাকাটিও
নেই। এসেছি,
যাব, ফিরে আসব।
চারপাশের দৃশ্য তো চোখে
লেগে থাকবে। হায়
হায় করার কিছু নেই। এখন
ভারতে ওয়েদার বলে কিছু
হয়না। যখন
তখন আকাশ ঢেকে যায়। কৌশিকবাবু
বলেন, যখনই কিছু পাবেন
না, তখনই জানবেন ওটা
আপনার জন্য ছিলনা।
আমি বললাম, একদম, সেই
হেমন্ত মুকুজ্জের গান, ‘যা কিছু
পেলাম নাকো...’
হরিদ্বার
স্টেশনে
নেমেই দেখে নিলাম, ইংরিজিতে
হারিদ্বার-ই লেখা আছে। কিন্তু
আগে যে হার্ডোয়ার লিখত?
আমরা মজা করে বলতাম
হার্ডওয়্যারের দোকান। সাহেবি
নামগুলো বেশ কিছকাল ধরেই
বদলাচ্ছে ভারতজুড়ে। ওরা
উচ্চারণ করতে পারতনা বলে
বর্ধমান কে বার্ডওয়ান লিখত,
চন্দননগরকে ‘চন্ডারনেগোর’, মুম্বাইকে বোম্বে তো বলতই,
খুব অসুবিধেয় পড়েছিল ত্তিরুচ্চিরাপ্পল্লি কে নিয়ে। তাকে
লিখত ‘ট্রিচিনোপোলিস’ আর তিরুবানন্দপুরম কে
‘ট্রিভ্যান্ড্রম’। কিন্তু
হরিদ্বার কে হার্ডোয়ার কি
তাই? নাঃ আসলে ওটা
হরদোয়ার বা হরদ্বার এর
ইংরিজি। কেবলমাত্র
ব্যাঙ্গলিরা বলত ‘হরিদ্বার’, আর
কম বয়সি বেধবাগুলোকে মাথা
মুড়িয়ে বান্ডিল করে পাঠ্যে দিত। ঘরে
থাগলিই চরিত্তির খুইয়ে বসবে।
ত্যাখন আইবুড়ো সোমত্ত মেয়েগুলোর
আর বে হবেনি।
তা ওখেনে গিয়ে কি
আর চরিত্তির ঠিক থাগত? তা
দেখার দরকার নি।
সতীদাহের চে তো ভাল।
তা বাঙালির হরিদ্বার উত্তর ভারতীয়দের কাছে
ছিল হরদোয়ার। দ্বার
অর্থাৎ দরজাটা হরের না
হরির, সেই বিতর্ক নিয়ে
একবার রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়েছিল এখানে। আমি
কোথাও পড়েছি আ ল্যাখ
অগ পীপল পেরিশড।
কিন্তু অফিশিয়ালি কইতে পারিনে।
কারণ কিছু বললেই লোকে
বলে লিঙ্ক দাও।
আমার পড়া রাশি রাশি
বইয়ের অধিকাংশই সেলুলোজ হয়ে উইদের ক্ষুন্নিবৃত্তি
করেছে। ত্যাখন
কি আর লিঙ্ক ছেল,
যে দুবো?
তবে সেকালে, যখন ভারতে কেউ
‘হিন্দু’ বলে কোনও ধর্মের
নাম শোনেনি, যখন গেরুয়া রঙ
ছিল ত্যাগের প্রতীক, দশলাখি স্যুটের নয়,
তখন ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম
ছিল ভারতে, শৈব, বৈষ্ণব,
লিঙ্গায়েত, গাণপত্য, ইত্যাদি। প্রথম
দুটিই প্রধান, তাদের মধ্যেই দাঙ্গা। তবে
হরদোয়ার নামটাই সঠিক মনে
হয়, কারণ চারধাম যাবার
এই তো প্রবেশদ্বার।
শিবুদার চেলারা সাহেবি হার্ডওয়ার
বদলে হরিদ্বার মেনে নিল কেম্নে,
এটাও রহস্য।
যাউক গিয়া প্যাচাল, আমরা
গাড়িতে চেপে বসলাম।
এখন নাকি রাস্তায় কাজ
হচ্ছে। ‘কাজ’
মানে সেই বাকি গোটা
ভারতের মতো পাহাড় কেটে
টু লেন কে ফোর
লেন বানানো। কেন
ভাই? অরুণাচলে, সিকিমে, দার্জিলিং পাহাড়ে সে নির্দয়
ভাবে পরিবেশ ধ্বংস করে
রাস্তা হচ্ছে, তা নাকি
চাইনিজ বর্ডারে ট্যাঙ্ক নিয়ে যাবার জন্য। তা
এখেনে কেন? এখেনে কি
যুদ্ধু হবা? নাঃ এখানে
রাস্তা চওড়া হচ্ছে চার
ধাম যাবার পথ সুগম
করতে, অ্যাজ ইফ, আগে
খুব দুর্গম ছিল।
কথাটা মিথ্যে নয়, কারণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেল
অক্ষয় তৃতীয়ার আগেই নাকি যেন
তেন প্রকারেণ রাস্তা চওড়া করা
শেষ হয়, তাই হুকুম। অক্ষয়
তৃতীয়ার দিনই কেদার বদ্রির
দরজা খোলা হয়।
আমাকে
ফিরোজ হুসেন বলেছিল, আরে
দাদা ছোড়িয়ে না উওহ
সব লঢ়াই ওঢ়াই কি
বাত। অসলমে
ইয়ে রস্তা বনানেকা কারণ
জানতে হ্যাঁয়? খুব সহজ কথায়
বলেছিল সে। আসলে
ভারত ব্যাপি যত ‘উন্নয়ন’
সবই টাকার খেলা, সে
কেন্দ্রেই হোক বা স্টেটে। বাঙালি,
থুড়ি ভারতবাসি ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ হিসেবে
জানে রাস্তা আর ওভারব্রিজ। যত
বানাবে তত টাকা।
টাকা কোষাগার স্যাংশন করবে, তার আগে
আমজনতার পাইন মেরে ট্যাক্স
নিয়ে কোষাগার ভরবে, তাপ্পর রাস্তার
টেন্ডার ডাকো, সবটা এক
লোককে না, পাঁচ মাইল
করে এক এক জন। টেন্ডারের
টোয়েন্টি পারসেন্ট ইয়ে মানে হেঁ
হেঁ। আর
কী, উন্নয়ন হি উন্নয়ন। কেবল
সত্যেন্দ্র দুবের মতো কিছু
বোকা লোক শহীদ হয়ে
যান কিন্তু মরনোত্তর পদ্মশ্রীও
দেয়না কেউ। পুলিশ
তো ডাকাতির মামলায় কেস করেছে।
উন্নয়ন
চলছে চলবে। এখনও
নোটায় ভোট পড়ে পাঁচ
শতাংশেরও কম। মূর্খসঙ্গমকারী
জেনেগেন।
নীচের
প্রথম ছবিটা বৃষ্টির মধ্যে
ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েই নেওয়া। আরে
যতই হরিদ্বার নাম দাও না
কেনে, ‘হর হর মহাদেও’। স্টেশনের
বাইরেই তিনি। আর
একটি এগিয়ে একটা কলোসাল
মূর্তি আছে। তার
ছবি নিতে পারিনি।
পাঁচ জনের সংসারে যখন
তখন যেখানে সেখানে গাড়ি
থামানও যায়না। তা
ছাড়া এ ড্রাইভারটি অত্যন্ত
ব্যাদড়া, আমাদের কুমায়ুনের দীনেশের
মতো একদমই না।
যাই হোক সে মূর্তি
দেখলে বাঙালি কিছুটা অনভ্যস্ত
চোখে ঘেবড়ে যায়।
আমাদের শিব হলো ‘বুড়ো
শিব, ভুঁড়ো শিব’, তার
গায়ের রঙ সাদা, তার
ইয়াব্বড় ভুঁড়ি, তার খয়েরি
রঙের জটা, তার কোমরের
ব্যঘ্রচর্ম এই খুলে পড়ে
গেল বলে। তবে
ইনভেরিয়েবলি যে চর্ম লেপার্ড
বা গুলবাঘের, টাইগারস্কিন নয়। সে
যুগেই বোধহয় বাঘমারায় পাবন্দি
ছেল। সোজা
কতায়,
‘মেনকা
মাথায় নেল ঘোমটা
বুড়া বরে বিহা দিলি,
সে যে চিরকালে ল্যাংটা’
এ শিব সে শিব
নয়। একনজরে
দেখলেই মালুম হবে সিক্স
প্যাক যুবক রামচন্দোরের বিক্রী
না হওয়া মূর্তি একটু
পাল্টে গায়ে একখান সাপ
জড়িয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার
গায়রের রঙও নীল, শুধু
কণ্ঠটি নয়। যাক
গে শালা উত্তুরেরদের ব্যাপার
স্যাপার। আমরা
বুড়োশিবেই খুশি।
চলল গাড়ি, হৃষিকেশ, লছমণঝুলা
পেরিয়ে গেল, আজকাল রামঝুলাও
হয়ে গেছে, হরিদ্বারের ঘাট
ফাট এখন বাঁধিয়ে, ভাগিরথীকে
চ্যানেলে বেঁধে এলাহি কাণ্ড। শ্রীনগর
গেল, শ্রীকোট গেল। এই
হৃষিকেশে আগে লোকে বেড়াতে
আসত। এখন
গিজগিজে শহর। আমরা
পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি।
একটা জিনিস খেয়াল করলাম,
এখানকার স্থানীয় লোক ‘গঙ্গা’ না
বলে ‘ভাগিরথী’ বলেন। বেশ,
তা হোক, গাড়ি চলছে।
এখানে
অলকানন্দার জল এসে ভাগিরথীর
সঙ্গে মিশে যাচ্ছে (ছবি)
যাই বলুন, তৃপ্তি হচ্ছেনা। এখানে
দেওয়া ছবি এত্তটুকু হবে। ‘নোট’
এর ছবিগুলো কী বিশাল, কি
রিজলিউশন তাদের(দীর্ঘশ্বাস)।


dada - chhobite click korlei to asol resolution dekha jachhe
ReplyDeleteজুকুভায়ার সাথে আপনার যুদ্ধু মিটুক .... ততোদিনে ঘোলের স্বাদই ভালো ...😂
ReplyDeleteAs usual daroon....opekkhay thaki.
ReplyDeleteতড়তড়িয়ে পড়ছি ৷ তবে গানটা তো — মেনকা মাথায় দিল ঘোমটা ৷ তবে পূর্ণদাস বাউল গাইতেন — মেনকা মাথায় দেলো ঘোমটা ৷
ReplyDeleteপরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম ৷
ছবি দারুন। নো চিন্তা ওনলি রাইটিং দাদা :-)
ReplyDeleteছবিগুলো তো মোবাইলে ভালই দেখা যাচ্ছে ৷ জুম ইনও করে দেখলাম ৷ তবে ডেস্কটপে/ল্যাপটপে গোটা স্ক্রীন জুড়ে দেখার মজা অবশ্যই আলাদা ৷
ReplyDeleteহুম। পড়ছি।
ReplyDelete