Thursday, 3 May 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) – ১৭






অনেক তো নিসর্গ টিসর্গ দেখা হলো, এখন তো পাখি দেখা হবে, নাকি? কিন্তু ম্যান প্রোপোজেস, গড এক্সপোজেস। মানে এক্সপোজেস ইউ টু সামথিং বিয়ন্ড ইয়র এক্সপেক্টেশন। এই পাখি বা পশুর ব্যাপারেও, মানে আমি পশুতে অত ইন্টারেস্টেড নই তাই, মানুষ যা চাইবে তক্ষুণি তা পাওয়া নাও যেতে পারে। কিন্তু এক সময়ে না এক সময়ে জুটে যাবেই। আসলে কয়েক মাস আগেই কুমায়ুন ট্যুরে আমি বেশ কয়েকটা কাঠঠোকরা পেয়ে গেছি। পেয়ে গেছি মানে বেশ ভাল ভাল স্ন্যাপ পেয়েছি। এমনিতে তারা সংগ্রহে আগেও ছিল। কিন্তু আলো কমে গেছিল বলে ‘ধওলছিনা’তে  একতা হিমালয়ান উডপেকার পেয়েও তেমন ভাল হলনা। তাই আমার পুরো কন্সেন্ট্রেশন এখন তার দিকে। সেই হিমালয়ান উডপেকার পেতে গিয়ে কত বড় মিস হয়ে গেল বলি। আগে ছবি একটা দেখুন তার। এটা ফিমেল। কাঠঠোকরাদের স্ত্রী পাখিদের মাথা হয় কালো নয় বিবর্ণ হয়। পুরুষদের লাল। 



আমরা তো আগের জায়গাটা থেকে বেরিয়ে অন্য দিকে যাচ্ছি। আমি কিছুই চিনিনা, মনেও রাখতে পারিনা। বিশ্বজিত দেখি দুমদাম নাম বলে দেয়। অবশ্য কুমায়ুনের কিছু জায়গা আমি নখদর্পনের মতো চিনি। নামও জানি। কেন এমন হয় কে জানে। যাই হোক এ্টা কুমায়ুন নয়, গাঢ়ওয়াল। আমি কিচ্ছু না জেনে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছি। এর মধ্যে একটা পাখি বোধহয় কৌশিক মাইতি স্পট করেছে। তার অসম্ভব ভাল চোখ। পাখিটা সামনে থেকে পেলাম কিন্তু পাশ থেকে পেলে আসল রঙটা বোঝা যেত। যাক কী আর করা। এর নাম হোয়াইট ব্রাওড শ্রাইক ব্যাবলার



এবার গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা। বেশ খানিকটা গিয়ে নেমে পড়া। আমার বন্ধুরা সব যাচ্ছে হেঁটে হেঁটে। গাইড কোথাও একটা গেছে। আমি একটু পিছিয়েই পড়েছি কিছু একটার ছবি তুলতে গিয়ে। এদিকে অম্লান আর কৌশিক মাইতি থেমে কী একটা আলোচনা করছে, আমি এগিয়ে গেলাম।



শুনলাম ওরা বলছে একটা কাঠঠোকরার আওয়াজ পাচ্ছে। আমি চোখ সরু করে খুঁজতে থাকি। ওই ওই তো, একটা হিমালয়ান উডেপেকার, যাঃ উড়ে গেল। নীচের দিকে নেমে গেল মনে হচ্ছে। কে যেন বলল আর একটা আছে ধারে কাছে। আমি খুঁজে যাচ্ছি তন্ময় হয়ে, একে আমার লাগবেই। তাকে মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছি এদিক ওদিক, আবার কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। তার পেছনেই ক্যামেরা তাক করে একবার এপাশে, একবার ওপাশে দৌড়চ্ছি। তাকে পেয়েও আর গোটা তিরিশেক ছবি নিয়েও যেন মনে হচ্ছে কোনওটাই শার্প ফোকাস হলোনা। এদিকে ব্যাক বাটনটাও খারাপ হয়েছে, কোনও কাজই করছেনা। তাই আমি লেগেই আছি ওর পেছনে।



হঠাৎ কানে একটা অদ্ভুত আওয়াজ এল। আওয়াজটা আমার চেনা। এটা রেকর্ডেড কলারড আউলেটের ডাক। কলারড আউলেট একটা ছোট্ট পেঁচা। কিন্তু এর ডাক বাজালে ছোট ছোট রঙিন পাখিরা, মানে টিট, ইউহিনা, ওয়ার্বলার, এরা যেখানেই থাক, ছটফট করে বেরিয়ে আসে। ও ডাক আমার মোবাইলেও লোড করা আছে। আসলে পাখিদের মেটিং কল যান্ত্রিক ভাবে বাজিয়ে বের করে আনা এথিকালি অনেকের পছন্দ নয়। আমার নিজেরই নয়। কারণ সমানে একটা নকল ডাক শুনতে শুনতে পাখিরা আসল ডাক শুনেও মেট করতে চাইবেনা। ভাববে ওই দুপেয়ে জন্তুগুলো বাজাচ্ছে। তাতে এদের বংশরক্ষাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। তার চেয়ে এটা বাজানো ভাল। কলারড আউলেটের ডাক বাজালে ছোট পাখিগুলো যখানেই থাকুক হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে। দেখতে আসে, তাদের পরম শত্রু ঠিক কোথায় বসে আক্রমণের প্ল্যান ভাঁজছে।


তা সেটা কেউ বাজাচ্ছে, নাকি সত্যি কলারড আউলেট এল একটা? দেখি আমি যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ হিমালয়ান উডপেকারের ধ্যান করছিলাম, তার ঠিক ওপরের রাস্তায় গাইড দীনেশ একটা মোবাইল আর একটা ব্লু টুথ স্পিকার নিয়ে ডাক বাজিয়ে চলেছে আর আমার বন্ধুরা পটাপট স্ন্যাপ নিচ্ছে। ডাক বাজালে সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিতে হয়, নইলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাঁওতা টা ধরা পড়ে। আমি পড়ি কি মরি করে ওপরের রাস্তায় উঠে এলাম। ততক্ষণে যে পাখিরা বেরিয়ে এসেছিল, তারা ফিরে যাবার তাল করছে। আমি একটাকে টার্গেট করে ক্যামেরার শাটার মারতে লাগলাম।


আসলে কী হয়, এই ছোট্ট পেঁচার ডাক বাজালে ছোট ছোট পাখিগুলো ভয়ে দৌড়োদৌড়ি করতে থাকে এ্ডাল থেকে ওডাল। খুব ফাস্ট মুভমেন্ট। তাই যে কোনও একটাকে টার্গেট করে বার্স্ট চালাতে হয়। এমনই কপাল, আমি যেটাকে প্রথম ধরলাম, সেটা একটা ওয়ার্বলার। আর কী ওয়ার্বলার কে জানে, কারণ চোদ্দ পনেরটা শটের মধ্যে মাত্র দুটো হলো, তাও খালি মুখ আর লেজ দেখা যাচ্ছে, বাকি শরীর পাতার আড়ালে তাই ওটা আর দিলাম না। এদিকে পাখিগুলো বুঝে গেছে যে ফলস পেঁচার ডাক বাজাচ্ছে কেউ। তাই তারা এবার যে যার গাছে বা ঝোপে ফিরে যাচ্ছে।  এর পরে যেটা ওপেন পার্চে এসে বসল, আমি বাধ্য হয়ে সেটাকেই টার্গেট করলাম। এটা একটা গ্রীন টেলড সানবার্ড



এ পাখি আমার অনেক আছে। শুধু তাই নয়, খুব কাছ থেকে তোলা দারুণ শট আছে। এর পেছনে না থেকে অন্য নতুন পাখির দিকে সেতে পারতাম। কিন্তু তা হয়না। এই ছুটোছুটির মধ্যে যে্টা সামনে পাওয়া গেল, তাকেই নিশানা করতে হয়। বন্ধুদের কেউ কেউ আলট্রামেরিন ফ্লাইক্যাচার পেয়েছে। আমার আছে, কিন্তু ভাল শট নয়। তাই খানিক খেদ রয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে বড় আ্ফশোষ, ওই ভিড়ে একটা ফায়ার ক্যাপড টিট ছিল। সেটা কেউই পায়নি। ওটা কেউ পেলে আমায় সুইসাইড করতে হতো। ভাগ্যিস কেউ পায়নি। যাক সেই পাখিই চোখ পাকিয়ে ক্যামেরাম্যানকে দেখছে, তাই দেখাই।



এর মধ্যে বিশ্বজিত আমার একটা ছবি তুলল। খাদের অত ধারে দাঁড়ানোটা ঠিক হয়নি, বলুন?



(চলবে)


14 comments:

  1. কী সুন্দর হলুদ রঙের পাখি!

    ReplyDelete
    Replies
    1. একে আবার দেখাব। আলোর বিপরীতে ভাল করে খোলেনি রঙটা।

      Delete
  2. অনিন্দ্য সুন্দর ছবি ও অনবদ্য লেখায় মজে আছি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনারা পড়েন বলেই না লিখি। সঙ্গে থাকুন।

      Delete
  3. দাদা, গ্রীন টেলড সানবার্ড এর ছবিগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড এমন সাদা হল কী করে? এডিট করলেন ?

    ReplyDelete
    Replies
    1. এডিট তো করতেই হয়, তবে ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা এমনিতেই ছিল। হোয়াইট ব্যালেন্সে টেনে নিয়েছে। আকাশ নীল থাকলে এমন হতোনা।

      Delete
  4. ফায়ার ক্যাপড টিট টা এসেছিল কিন্তু পিছনের ডালে।ভালো করে দেখার আগেই ফুরুত।আমাদের আগে যারা গেছিল তার ভিতর অভিজিৎ খুব ভালো পেয়েছে।পোস্ট ও করেছে। লাক টা বিরাট ফ্যাক্টর।কেও খুব কাছ থেকে একটা রেয়ার পাখি পেয়ে যান। এই দেখুন না আপনারা তিনজন সেরিন পেলেন।আমরা দুজন পেলাম না।আবার আমরা আসার পরেই অন্য গ্রূপের লোক পেলো।সুইসাইড করবেন কেন বালাই ষাট😆😆😆😆।নেক্সট বার পাবোই।এবারেও মন্দ আলো ইত্যাদি হলেও পাখি তো অনেক পেয়েছি।আলট্রা মেরিন টাও পাবেন।ক্যামেরার বডি পারলে কারুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যাবেন।আপনাকে কেও না করবে না।

    ReplyDelete
    Replies
    1. না না অন্যগুলো আমার আছে কোথাও না কোথাও। কিন্তু ফায়ার ক্যাপড এদিকের পাখি নয়, আর খুবই দুর্লভ।

      Delete
  5. ছবিগুলো তো সুন্দর বটেই। তবে খাদের অত ধারে দাঁড়ানো...আপনার সাহস আছে। আমার তো নীচে তাকালেই মাথা ঘোরে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. সে আমারও ঘোরে। নীচে তাকাইনি তো।

      Delete
  6. ohh ! darun...fire capped tit shudhu apni e pelen? .... apni to dekhchhi bhison selfish etar byapare.... btw, man proposes god exposes ta darun hoechhe...ami etake byabohar korbo..... garwal ta khub bhalo lagchhe...hothath shesh hoe jabe konodin, tai sheshe lekha 'cholbe' ta scroll kore agey dekhe ni protibar

    ReplyDelete
  7. আমি আর পেলাম কই। কেউই পাইনি। বলছিলাম যে দেরি করে ওপরে উঠলাম, তাই আমি না পেয়ে অন্যরা পেলে আমায় সুইসাইড করতে হতো। কিন্তু কেউই পায়নি তাকে।

    ReplyDelete
  8. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...