চোপতা,
কী অপার সৌন্দর্য, বর্ণনা করি কীভাবে! ধরুণ যদি নীচের ছবিটাই দেখাই, (ছবিতে ক্লিক করলেই বড় করে দেখা যায়) প্রথমে গাঢ় সবুজের স্তর, তারপর হালকা থেকে হলুদ, তারপর লাল দিগন্ত জুড়ে। তার ওপারে
নীল পাহাড়। দেখতে কি পাচ্ছেন? না। কিন্তু কোনও উপায় নেই এর চেয়ে ভাল করে দেখানোর।
যেখানে শুধু বরফ আর পাহাড়, আর কিছু মেঘ, সেখানে দারুণ ফোটোগ্রাফি করা যায়। কিন্তু এখানে যায়না। একেই তো
আমার নরমাল লেন্স নেই। আগে একটা বাড়তি ক্যামেরা আনতাম, কিন্তু দলের সঙ্গে এলে
সেটাও বার বার বের করা ঢোকানোয় অসুবিধে। আমার আসাম ট্যুরে একাই ছিলাম বলে সে সব
ছবি অনেক তুলেছি। যাক ছবিটা দেখাই, কিছুই বুঝবেন না যদিও।
জঙ্গলের রূপ ছবিতে বোঝানো যায়না। একেবারেই যায়না তা নয়, খুব দামি ইকুইপমেন্ট,
মানে চার পাঁচ লাখি লেন্সে কিছুটা আনা যায়। তবে পাখিপাড়া লেন্সে তা একেবারেই
অসম্ভব। যে তিনটে লেয়ারের রঙে মুগ্ধ হয়ে এ ছবি নিয়েছিলাম, তা দেখানো গেলনা। যাবেনা
জানতাম। আমি নিজেই মুগ্ধ চোখে দেখি আরকী!
আরও অসুবিধে হলো, আমাদের এবারের ড্রাইভারটি কুমায়ুনের দীনেশ নয় (এখানকার
গাইডের নাম আবার দীনেশ) এই যুবকের নাম মুকেশ রাণা। গাইডের পেটোয়া, আমাদের কাছ থেকে
যা ভাড়া হওয়া উচিত, তার অনেকটাই বেশি নিয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও এখানে একটু দাঁড়া
বাছা, একটা ছবি তুলে নিই, বললে সে দাঁড়াবেনা। তার প্রভু না বললে তার আদেশ সম্পূর্ণ হয়না। শুধু তাই নয়, আমি তো পাহাড়ে ঘুরছি হাফ পেন্টুল থেকে। যেখানে সেখানে দাঁড়াও
বললেই হয়না। বাঁকের মুখে, যেখানে রাস্তার পাশে মার্জিন বেশি, দুটো আপ ডাউনের গাড়ি
অনায়াসে যেতে পারে, সেখানেই দাঁড়াতে বলি। তবু সে দাঁড়ায় না। তাই কিছু অমূল্য ছবি
দেখাতে পারবনা আপনাদের। হ্যাঁ পাখির ছবি হবে, এই তো দিচ্ছি, এপাখিটার নাম স্কেলি বেলিড
উডপেকার (ফিমেল) অনেকক্ষণ ধরে অদ্ভুত আওয়াজ করে ডাকছিল। এর ছবি আমি ছাড়া কেউ নেয়নি
বোধহয়। গাইড দীনেশ বন্ধুদের অন্য কিছুর দিকে পরিচালিত করছিল।
এর পরের ছবিটা হতাশার, তবু দেব এখানে। এর নাম কোল টিট। কিন্তু আমি ছবি তুলতে
পারিনি। পারিনি অর্থে, এটা ছবি নয়। এ এমনই পাখি, যাকে সম্পূর্ণ প্রোফাইল, মানে পাশ
থেকে ঠোঁট আর লেজ পর্যন্ত না দেখানে এর কিছু বোঝা যায়না। এ এলাকায় কোল টিট অনেক
আছে। বিশ্বজিত একটাকে পেয়েছে দেখলাম। আমি অনেক ছবি নিয়েছি, কিন্তু সবই এরকম।
এবার পাখি নয়, পশু, পাহাড়ি ছাগল, বন্য। কুমায়ুনে পঙ্গোটে এদের ছবি দিয়েছলাম
অনেক দূর থেকে। এখানে একদম এদের টেরেন এ ঢুকে পড়েছি। এদের কেতাবি নাম হচ্ছে
হিমালয়ান তাহ্র (Tahr). উচ্চারণটি কষ্টসাধ্য, তাই স্থানীয়
বা বাইরের লোক, অনেকেই ‘থার’ বলেন। কিন্তু আসলে তাহ্র। এদের চেয়ে অনেকটাই অন্যরকম, বড় শিঙ ওয়ালা নীলগিরি তাহ্র পাওয়া যায় পোরতিমুণ্ড গেলে। একবার গেছিলাম, ইহজীবনে আর যেতে পারব
বলে প্রত্যয় নেই। আপনাদের বলি, কেউ যদি পারমিশন নিয়ে(অথবা লুকিয়ে, ঘুষ দিয়ে) যেতে
পারেন, স্বর্গ কাকে বলে, একটা আন্দাজ নিয়ে আসবেন। মানে দিগন্ত বিস্তৃত প্রকৃতির
মধ্যে আপনি ছাড়া কেউ নেই, কেউ না। বেশি দলবল নিয়ে যাবেন না, ধরা পড়ে যাবেন। দুজন
আইডিয়াল, ‘আপনারা দুজন’।
হিমালয়ান তাহ্র একটু কাছ থেকে। আমাদের দুর্ভাগ্য, ফিরে আসার পথে এদের এক
শিশুকে দেখলাম পাহাড় থেকে পড়ে গেছে রাস্তায়, মৃত। কচি বাচ্চাটা কী সুন্দর, কিন্তু
প্রকৃতি প্রাণ কেড়ে নিল।
এবার এক পাখি দেখাই। সকালের দিকে এক জায়গায় আমরা দাঁড়িয়েছি, কী কাজে মনে নেই।
সামনে কয়েকজন জনমজুর রাস্তার কাজ করছিলেন। বেশ কয়েকটা বাঁদর সামনে এদিক ওদিক
লাফালাফি করছিল। এদিকে সেই প্রথম দিন থেকেই আমার জায়গা হয়েছে পেছনে। কারণ পেছনে
যেই বসছে, তারই বমি হচ্ছে। আমি তো নীলকণ্ঠ, কিছুই হয়না। তাই আসেপাশে কোনও পাখি
থাকলেও দেখতে পাইনা। তা বিশ্বজিত হঠাৎ নেমে গেল। গিয়ে কী একটা তুলছে মনযোগ দিয়ে।
ওখানে বাঁদর ছাড়া কিছু ছিলনা, মানে অন্যরা কেউ দেখিনি। আমার তো প্রশ্নই নেই, পেছন থেকে
কিছুই দেখা যায়না। অনেকক্ষণ ধরে সে অত মনযোগ দিয়ে কী তুলছে, এই অনুসন্ধান করতে একে
একে সামনের লোকজন নেমেছে। আমি অনেক পরে। এদিকে খাদের দিক থেকে মজুররা উঠে আসছেন।
আমি তো বললাম অনেক পরে নেমেছি। দেখি কী, একটা ছোট্ট পাতাবিiহীন গাছে অনেকগুলো একই
জাতীয় পাখি। এদিকে মজুররা প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তাঁদের হাত নেড়ে প্রাণপনে
বলছি, পিছিয়ে যাও, পিছিয়ে যাও, পিছে হঠো। তাঁরাও কিছু বুঝছেন না কিন্তু ঘাবড়ে
যাচ্ছেন। পাখিরাও ঘাবড়েছে বিস্তর। তারা উড়ে পালাবার আগে গোটা চারেক শট মারতে
পেরেছিলাম। তারপর মনিটর দেখে মাথা চাপড়াচ্ছি, এগুলো অ্যালপাইন অ্যাকসেন্টর। চট করে
পাওয়া যায়না। কিন্তু আমি প্রচণ্ড এক্সাইটমেন্টে লেন্স খুলতে ভুলে গেছি। সব উঠেছে
একশোয়। এমনিতেই অন্যদের ৫০০ কিংবা ৬০০। আমারই চারশো। তাও খোলা হয়নি। আমি কপাল
চাপড়াচ্ছি। আর কি চোপতা আসতে পারব? আহা অ্যালপাইন অ্যাক্সেন্টর। বিশ্বজিত তো রেগে
লাফাচ্ছে, আপনি ভাবলেন আমি বাঁদরের ছবি তুলছি, বাঁদরের? আমি কি পাগল? নিন এবার
একশোর স্ন্যাপ নিয়ে বসে থাকুন। তা ঈশ্বরের দয়া হলো। এই জায়গায় এসে আবার তাকে পাওয়া
গেল। এক ঝাঁক নয়, একটাই। আর আমারও একটাই শট হলো। তাও হলো তো!
দূরের আকাশ থেকে নীচু ফ্লাইটে একটা পাখিকে উড়ে আসতে দেখা গেল। খুঁজছিলাম
এটাকে। গাইড দীনেশও বলল, উওহ লিজিয়ে আপকা ‘ল্যামারগিয়ার’। আমার পুরনো পাঠকদের মনে
থাকবে কুমায়ুনে দীনেশ(সেই দীনেশ) কিছুতেই ল্যামারগিয়ার বলতে পারেনা। খালি বলে
‘গ্ল্যামার’। সোমনাথ পড়ল তার পেছনে, বলল, ‘গাড়িকা গীয়ার হোতা হ্যায় না, উওহ
‘গীয়ার’। অওর উসসে পেহলে ‘ল্যামার’। তা দীনেশ তাও বলে গ্ল্যামারগিয়ার। যাই হোক ওখানকার
পাখিটাকে তিন বছর ধরে টার্গেট করছি, সে বালক থেকে কিশোর, সেখান থেকে টীনএজার হব
হব করছে। এরা মানুষের মতো, অনেক ধীরে বাড়বৃদ্ধি। তা বড় না হলে তো পুরো রঙ খুলবেনা।
এখানে কিন্তু পাখিটা বড়ই এবং পুরুষ।
আরও কাছে এলে আর একটু ভাল শট নেওয়া গেল। কিন্তু শার্প হলোনা। তবু চোখ দেখা
যাচ্ছে। এরা ল্যামারগিয়ার ওরফে ‘বেয়ার্ডেড ভালচার(দাড়িওয়ালা শকুন)। দাড়িটা দেখতেও
পাচ্ছেন,(বড় করে দেখুন) ছোট্ট নুর টাইপের দাড়ি। এরাই একমাত্র শকুন যার গলার পালক থাকে আর অমন
কুৎসিত দেখতে হয়না। বসে থাকা অবস্থায় দাড়ির জন্য খানিক ভুতুড়ে লাগলেও খুবই সুন্দর
এই শকুন। অবশ্য বসে থাকা অবস্থায় পাইনি তাকে আমরা এবার।
(চলবে)









এই শকুন দেখতে মোটেও 'শকুন' এর মত না, রীতিমতো ভদ্রস্থ।
ReplyDeleteআপনি পাখালিনামা দ্বিতীয় খন্ড লিখুন, অনুরোধ রইল।
আগের লেখা গুলো ব্লগে দেওয়া যাবে?
দেওয়া তো যাবে। কিন্তু অনেক সময়ের প্রয়োজন। আমার এখন মরার ফুরসৎ নেই। তবে সময় পেলেই দেব।
Deleteস্ক্যালি বেলিড উডপেকার ফিমেল টা সবাই তুলেছে দাদা। আমি তুঙ্গনাথ গেছিলাম ওখানেও একটা পেয়েছি।গাছের কোটরে।
ReplyDeleteও, আচ্ছা। আমি যখন নিচ্ছিলাম। তখন সবাই অন্য কী একটা তুলছিল। তাই ভাবলাম।
ReplyDeleteBah !
ReplyDelete