Sunday, 29 April 2018

পোথি পথিকরা ( The bird travellers) - ১৪







মোনা ডারলিং



খেয়াল করবেন, ‘ডার্লিং’ না লিখে ‘ডারলিং’ লেখা হলো। যাঁরা এযুগের মানুষ, তাঁরা এই পুরনো রসিকতাগুলো বুঝবেন না সম্ভবত, তাই ব্যাখ্যার প্রয়োজন। কয়েক দশক আগে, বোম্বের (আমি ডেলিবারেটলি ‘বলিউড’ শব্দটা লিখিনা, তবে ব্যঙ্গার্থে ‘টলিউড’ লিখি।) হিন্দী ছবিতে নানারকম ভিলেন রাজত্ব বা দাদাত্ব করতেন। আমি বলছি প্রি-অমরিশ পুরী এরার কথা। তখন প্রাণ, জীভন, রঞ্জিত, প্রেম চোপড়া, আদি অনেকেই ছিলেন। একজন ছিলেন অজিত। এই ভিলেনটি এতই বোকা বোকা ডায়ালগ বলতেন (হয়ত বলানোই হতো) যে সে সময় ‘অজিত জোকস’ চালু হয়ে গেছিল সারা প্রিন্ট মিডিয়া জুড়ে। তখন টেলিমিডিয়া ছিলনা। অজিত জোকস এতই পপিউলার হয়েছিল, যে স্কুল কলেজে ব্যাপক ছড়িয়েছিল। আর শেষমেশ যে কোনও জোকেই অজিতকে ঢুকিয়ে অজিত জোকস করে ফেলা হচ্ছিল। তা এই অজিতের এক সহকারী, তার নাম ‘রোবার্ট’( মানে রবার্ট আর কি) আর এক সহকারিনী, তার নাম ‘মোনা’। লাল চুল ওয়ালা অজিত মোনা কে ডাকতেন ‘মোনা ডারলিং’ বলে। এই কমিকাল ভিলেনি এত জনপ্রিয় হয়েছিল, যে অজিত থাকা মানে একসঙ্গে কমেডিয়ান আর ভিলেন পাওয়া। প্রোডিউসারদেরও হট প্রপার্টি।


তা বার্ডারদের হট প্রপার্টি হচ্ছে ‘মোনাল ডারলিং’। মোনাল মোনাল করে পাগল সবাই। আমি পাগল নই, কারণ মোনাল আমার পকেটে বেশ কিছু আছে। এটা হিমালয়ান মোনাল।  কপালে থাকলে আর  জীবদ্দশায় উত্তর পূর্বের রাজ্যে যেতে পারলে স্ক্লেটার্স মোনাল যদি পাই। যাই হোক পাখিবাজদের মুখে সব সময়েই শুনি মোনাল মোনাল। অথচ মোনাল যেখানে থাকে সেই একই এলাকায় আরও কিছু দুষ্প্রাপ্য ফেজ্যান্ট পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু সব চেয়ে বেশি নম্বর পায় এই ‘মোনাল’। কেন, তা আমি বুঝিনা। সব ফেজ্যান্টই সুন্দর। মোনালের গায়ে কাচপোকার মতো ফ্লুওরোসেন্ট রঙ আছে বটে, কিন্তু সেই যুক্তিতে ময়ূর কেন এত পপিউলার নয়? জঙ্গলে গেলে পাখিবাজদের ময়ূর নিয়ে তো এত আদিখ্যেতা করতে দেখিনা! সহজলভ্য বলে, নাকী?


যাই হোক আমাদের গাইডকে মানে দীনেশ নেগিকে আগেই বলে দেওয়া হয়েছে প্রায়রিটিতে মোনাল ওপরের দিকে। আর সে আমাদের নিয়ে চলেছে মোনাল অধিকৃত অঞ্চলে। পাহাড়ের গায়ে শুকনো হলদে ঘাস দেখেই বুঝলাম এসে গেছি মোনাল রাজ্যে, কারণ আমি প্রথম মোনাল তুলি মুন্সিয়ারিতে এমনই এক এলাকায়। তার পর থেকে যতবারই গেছি, সেখানেই পেয়েছি। তাই এখানেই পাওয়া যাবে বলে প্রত্যয়। তা আসতে না আসতেই চাপা স্বরে ওই, ওই, বলে হাঁক শুনে তাকাতে দেখি ওই যে, বাবু ঠিক হাজির। সেই এক ধরণের কালচে পাথর আর তাদের ফাঁকে শুকিয়ে যাওয়া হলদে ঘাস। আমার একবার মনে হয়, এ কি শুকনো ঘাসই? নাকি এর রঙই এরকম। কেননা যখনই আসি হলদেই তো দেখি। যাই হোক, মোনাল দেখুন।



শটটা ভাল হলো, বেশ পরিষ্কার। কিন্তু আমার সঙ্গীদের মন ভরেনি, তারা আরও কাছ থেকে চায়। শুধু তাই নয়, গাইড দীনেশ বলেছে, যে এর পর এমন ছবি দেব, যাতে আপনারা এসব ছবি ক্যামেরা থেকে ডিলিট করতে বাধ্য হন। তা জনগন তাতে খুবই উৎসাহিত, উত্তেজিতও। আমরা ছিলাম একটা বাঁকের মুখে, পথটা পাহাড়এর কোল ঘুরে গোল হয়ে এদিকে চলে এসেছে। আমরাও এলাম। আমাদের বাঁদিকে খাদ। কিন্তু খুব গভীর না, এই চল্লিশ পঞ্চাশ ফীট হবে, কিছুটা বাটির মতো। সেখানে কয়েকটা মাদি মোনাল ঘুরছিল। আমি  ছবি নিলামও মনে হলো। কিন্তু এখন আর পাচ্ছিনা। হয়ত ডিলিট করেই ফেলেছি ভুলে। যাই হোক একটি মোনাল নীচে পেলাম, কিন্তু সতর্ক না থাকায় তার ফ্লাইট শটটি পেলাম না। সেই পেলে অসাধারণ সুন্দর ছবি হতো।



এবার আমরা দুজন, আমি আর বিশ্বজিত এদিকে চলে এসেছি। বাকিরা ওদিকে রয়েই গেছে। দীনেশ পাগলের মতো হাত নেড়ে ওদের বলছে পিছিয়ে যেতে। কারণ এই মোনাল ওদিকে রাস্তা পেরিয়ে যাবেই। কিন্তু কৌশিক মাইতি পেছোতে রাজি নয়। এত হাতের সামনে পেয়েও ছেড়ে দেব? বলে সে তড়বড়িয়ে গেল তুলতে। মোনালটা উঠছিল, কঁক কঁক করে উড়ে পালাল। দীনেশ বলল, ও আবার আসবে। মিনিট কুড়ি দাঁড়াতে হবে। তা আমার বন্ধুরা কুঁজো হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। এলও সে। তারা ছবিও নিল। আমি খানিক তফাতেই থাকলাম। আমার কিছুটা দূরের ছবিই ভাল লাগে। তাছাড়া বড় পাখি তো, ক্রপ করেও যথেষ্ট ডিটেল পাওয়া যায়।



বীপরিত দিকে এক ঝর্ণার ছবি নিলাম দাঁড়িয়েই। অম্লান যেমন বলেছিল, তেমন শাটার ঢিলে করে কাসকেড নিলে হতো। কিন্তু তখন মনে ছিলনা।



এর পর পেলাম এক পাহাড়ি ফুল, পাথরের খাঁজে হয়ে আছে। অবহেলায় পড়ে থাকা এই সৌন্দর্যই টানে আমাকে। বাহারি টবের ফুলকে টেক্কা দিতে পারে যে কোনও স্পর্ধায়।



একটু বড় করে আবার।



 আসুন একটু শেষের কবিতা পড়ি

প্রভাত বেলায় হেলা ভরে করে অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ                               উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রন গুচ্ছ

পাহাড়ে আসবেন, রডোডেনড্রন দেখবেন না, তাও কি হয়? স্থানীয় ভাষায় ‘বুরান্শ‌’। আবার সিকিমে বলে ‘গুরাশ’।



আচ্ছা এবার পাঠকগণকে একটা ধাঁধা দিই - 
গাছের গুঁড়ি বেয়ে যে জন্তুটি উঠছে, তার নাম বলুন। বলতে পারলে প্রাইজ আছে।
উত্তর পরের পর্বে।





(চলবে)



18 comments:

  1. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  2. গাছের ভাঙা ডাল নাকি?? মস জমে জমে এরকম লাগছে??

    ReplyDelete
    Replies
    1. উত্তর পরের দিন।

      Delete
  3. লাস্টের ছবিটা ক্লাস দিলেন দাদা😆😆😆

    ReplyDelete
    Replies
    1. তুমি তো জান উত্তর। পরের দিন বলব অন্যদের।

      Delete
  4. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  5. আমার ধারনা গাছের গায়ে মস/শ্যাওলা জমে প্রাণীর আকৃতি নিয়েছে।

    ReplyDelete
  6. পরের দিন বলব।

    ReplyDelete
  7. আপনার লেখা ও ছবি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই...অসাধারণ। শেষের ছবিটা গাছেরই একটা অংশ বলে মনে হচ্ছে।

    ReplyDelete
  8. হ্যাঁ, তাই।

    ReplyDelete
  9. beautiful bird.
    ,,🤔(answer?)

    ReplyDelete
    Replies
    1. সবাই যা বলেছেন। ওই শ্যাওলাই।

      Delete
  10. prosno sohoj chhilo....mane amio ek e uttor likhchhilam...kintu aro oneke agei likhechhen .... btw, prize ta ki ebar bhag hobe naki prothom jon pabe? .... seta bole rakhle bhalo hoto....ami pabo ki pabo na.... !

    ReplyDelete
  11. সবাই পাবে একটু করে।

    ReplyDelete
  12. আমি প্রথমে গিরগিটি বা তক্ষক ভাবছিলাম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কিছু একটা তো মনে হবেই।

      Delete
  13. অপরূপ রডোডেনড্রন,নাম না জানা পাহাড়ী বনফুল, পাহাড়ী ঝর্ণা আর মোনাল ( আমার কাছে ময়ূরের ছোট সংস্করণ লাগল ) আর সর্বোপরি লেখার ভূমিকা খুবই আকর্ষণীয় ও অনবদ্য।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাঙ্কিউ দাদা।

      Delete

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...