Monday, 30 April 2018

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৫





ককল্যাস koklass এর খোঁজে



কালকের ছবিটা সকলেই ঠিক বলেছেন। কিন্তু ফেয়ার প্লে হয় নাই। ছবিটা ওই অবস্থায় দেখতে হতো। এনলার্জ করে নয়। আসলে ওই অবস্থায় দেখেও বলে দেওয়া যায় কিন্তু খালি চোখে যা দেখেছি, তা দেখলে কারও সাধ্য ছিলনা। আমি জঙ্গলে গেলে এমন জিনিষ সংগ্রহে রাখি। আমার তাড়োবা ট্যুরে একটা চাইনিজ ড্র্যাগন পেয়েছিলাম। সেটা বেশ সমাদৃতও হয়েছিল পাঠক/দর্শক মহলে। যাক ছবিটা আবার দিচ্ছি। সব কটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমনটি দেখা গেছে। কেবল কান দুটো আবার ঠোঁট বলেও চালানো যায়, যদি মুখটা ওপরে করা আছে মনে হয়। সে ছবিটাই দিচ্ছি নীচে।



এদিন মোনাল দেখার পর আলো কমে গেছিল। খানিক মেঘলাও হয়ে গেছিল। আমরা হোটেল বা যাই বলা হোক, সেখানে ফিরে গেলাম। জায়গাটি লোকেশনের দিক থেকে যথেষ্টই ভাল। ঘরদোরও বেশ ভাল। শুধু এক ঘরে তিনজনের থাকা একটু চাপের। তা এক ঘরে বিশ্বজিত-হিমাদ্রী, আর এক ঘরে দুই ডাক্তার ও তৃতীয় ঘরে আমার ঠাঁই হলো। একটা কথা বলে নেওয়া হলো, যে এই ঘরটার জন্য কিন্তু পুরো ভাড়া দেওয়া হবেনা। যাই হোক অ্যাকোমোডেশন বেশ ভাল হলেও এখানে খাবারের দাম অস্বাভাবিক বেশি। আবার একই খাবার ভিন্ন দিনে ভিন্ন দামে এসেছে। সে সব ডিটেলে গিয়ে লাভ নেই। আসলে গাইডের সঙ্গে এই হোটেল ও আমাদের গাড়ির একটা বন্দোবস্ত ছিল। আমাদের পোথিবাসায় এক রাতই থাকার কথা। পরের দিন আমাদের চোপতায় শিফট করার কথা ছিল। শোনা গেল গাইড নাকি বলেছে, আমরা এখানে থাকি তাইও নাকি ও চায়। এমনিতে আমাদেরও যে খুব আপত্তি ছিল তা নয়। পরে বুঝেছি, এখানে থেকে লাভ বই লোকসান হয়নি। কেবল খাবারটা পরের দিকে যেমন নিচ্ছিল, প্রথম দেড়দিন যদি তাই নিত।

পরদিন খুব ভোরে আমরা বেরিয়েছি। সেদিনের টার্গেট ‘ককল্যাস ফেজ্যান্ট’। আসলে মোনাল মোনাল করে পাবলিক ক্ষেপে গেলেও এটাই মূল টার্গেট হওয়ার কথা ছিল। আমার নিজের তো ছিলই। ককল্যাস কে খুব ভাল ভাবে ক্যামেরায় তোলা বেশ কঠিন, কারণ, মানুষ দেখলেই সে প্রাণভয়ে দৌড়ে বা উড়ে পালায়। এর গায়ের রঙ একেবারেই মোনাল সুলভ উজ্জ্বল কিছু নয়। তবে ভাল করে ঠাওর করলে অন্তত আমার চোখে তো সে মোনালের চেয়ে কম কিছু নয়। আমি খুব করে মুখিয়ে ছিলাম ককল্যাসের জন্য। এদিকে আমার কিছু হ্যান্ডিক্যাপও ছিল। আমি কিছু লোকের কথায় এবং আমার এক বিদেশি ফেসবুক বন্ধুর ছবি দেখে ক্যাননের সে্ভেন ডি কিনেছিলাম। তার সঙ্গে ১০০-৪০০ লেন্সও সেই বিদেশি বন্ধুর দেখাদেখিই। কিন্তু কিছুদিন ব্যবহার করেই বুঝলাম এতে অনেক ডিফেক্ট। নেটে রিভিউ গুলো পড়ে দেখলাম সারা পৃথিবীর নামকরা ফোটোগ্রাফাররা বলছেন সেভেন ডি তে ৪০০-র বেশি আইএসও তে তুললেই ফেটে যায়। এদিকে আমার যত পরিচিত বেশির ভাগই নিকন ব্যবহার করেন। তাঁরা ৩২০০ তেও বেমালুম তুলে যাচ্ছেন। অথচ কেনার আগে আমার তখনকার পরিচিত সবাই বলেছিলেন এটা দারুণ ক্যামেরা। এখন অনেকেই বদলে নিতে বলছেন। কিন্তু দুম করে এক দেড় লাখ খরচ করাও বেশ চাপের। আমি তেমন বিত্তবান তো নই। এর ওপর আর এক অসুবিধে। আমার লেন্স চারশো। আমার সঙ্গের অনেকেই বা সকলেই ন্যূন্তম ৫০০, অনেকে ৬০০ দিয়ে তুলছেন। সে সব লেন্স কিনতেও আরও প্রায় সম পরিমান টাকা লাগে। তাই সে সব দেখে খানিক ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগি। আমায় যাঁরা উস্কেছিলেন সেভেন ডি আর একশো-চারশো কেনার জন্য, তাঁদের থেকেও দোষ বেশি সেই বিদেশি বন্ধুর, যাঁর ছবি দেখে আমি ভাবতাম, আহা আমিও এমন তুলব। আসলে আমি ২০১২ পর্যন্ত অ্যানালগ ক্যামেরায় ছবি তুলেছি। ডিজিটাল যুগে অনেক পরে ঢুকে আর তাল রাখতে পারিনি।


আমাদের হোটেল থেকে চোপতা ১৫ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু যাবার পথেই ককল্যাস ফিমেল কে পাওয়া গেল। আমিই স্পট করলাম, একেবারে গাড়ির গা ঘেঁষে পথের ধারেই চুপটি করে বসে ছিল। আমরা সন্তর্পনে নেমে অনেক ছবি নিয়েছি। তখনও সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েই বসে ছিল ঠায়। কিন্তু আগেই বলেছি, অত কাছের ছবিও আমার একেবারেই খারাপ। কারণ একে ভোর বেলা, তায় ঘন জঙ্গলে আলো একদমই ছিলনা।




যাই হোক, ফিমেল তো পাওয়া গেল। কিন্তু আসল তো মেল। যত পালকের কায়দা আর রঙের বাহার তো তাদেরই। একটা মেল পাওয়া যাবেনা? হঠাৎ দীনেশ গাড়ি থামিয়ে বলল। নেমে ওদিকে যান, একটা মেল বসে আছে। এবার গাড়ি থেকে নামাও খানিক মুশকিল। আগেই বলেছি, আসার দিন থেকে পেছনে বসলেই সবার সের দরে বমি হতে লেগেছে, তাই আমি কনফার্মড ব্যাক বেঞ্চার। এবার পেছনের দরজা খুলে ক্যামেরা হাতে লাফ দিয়ে নামাও সোজা নয়। লাফালাফি করাও বিপজ্জনক। বেশি আওয়াজে পাখি পালাবে।


তাই বাকিরা নেমে এগিয়ে গেছে অনেকটা। আমি সবার পেছনে। আমি দেখলাম, কয়েকটা মোটা মোটা গাছ, তার ওধারে চলে গেছে কৌশিক, অম্লান আর হিমাদ্রী। আমি তাদের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে আর ককল্যাস থাকবেনা। সে মানুষ দেখলেই পালায়। তার চেয়ে বিশ্বজিত গাছগুলোর এদিকে আছে। আমি সেখান থেকেই মারি। গেলামও দৌড়ে। কিন্তু দু তিনটে গাছের মাঝে সরু একটু ফাঁক। বিশ্বজিত সেই ফাঁক থেকেই তুলছে। তাকে তো আর সরিয়ে দিয়ে তুলতে পারিনা, তাই তার পাশ থেকে উঁকি দিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। দেখলাম ককল্যাস বাবু ঘাড় ঘুরিয়ে উল্টোদিকে দেখছেন। মুখ না পেলে আর ছবি তুলে লাভ কী। শেষ মুহূর্তে একটা মাত্র ছবি নিতে পেরেছি, তাও ঠিক ফোকাসে নেই। এবারের মতো ককল্যাস ছাড়াই ফিরতে হবে, কী আর করা। যদিও নেগি বলল, ঠিক পেয়ে যাব, আরও তো দুদিন আছে। কিন্তু আমি জানতাম, কপালে ঢুঁ ঢুঁ।



একটা হোয়াইট কলারড ব্ল্যাকবার্ড পাওয়া গেল। এ ছবিটা পরিষ্কারই পেলাম।




একটা ফিমেল গ্রীন টেলড সানবার্ড দেখলাম। আমাদের কৌশিক মাইতির ফিমেলে অরুচি, সে মানুষ হোক বা পাখি। হাজার সামনে থাকলেও তুলবেই না। কিন্তু আমি নারী পুরুষে ভেদাভেদ করিনা, নিলাম তুলে।



এর পরে আর একটি ককল্যাস পেলাম বটে, কিন্তু তা এত দূরে ছিল, যে ছবির ৯০ ভাগই ক্রপ করতে হয়েছে। তাতে আবছা ভাবে চেনা যাচ্ছে বড়জোর। জানিনা আবার কবে আসতে পারব পাহাড়ে। ককল্যাস এর সঙ্গে দেখা হবে কবে বা কীভাবে।



(চলবে)



12 comments:

  1. এবার পাখালিনামা ২ হোক

    ReplyDelete
    Replies
    1. ওরে বাবা, সে তো দীর্ঘ পরিশ্রমের কাজ। আজকাল অত সময় পাইনা যে।

      Delete
  2. কোকলাস ফিজেন্ট তাড়াতাড়ি পাবেন।আমারও ওই দশা হয়েছে।আলোর জন্য মার খেয়েছে অনেক ছবি। পরের বার চেষ্টা করবো। তবে ভগবান আপনাকে অন্য দিকে দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছেন। রেড ফ্রন্টেড সেরিন।

    ReplyDelete
  3. হ্যাঁ, তা অবশ্যই ঠিক।

    ReplyDelete
  4. কোকলাস ফিজেন্ট যা দেখলাম তাই অনেক। পরে আবার যখন তুলবেন আবার দেখবো...

    ReplyDelete
  5. আপনাদের শুভেচ্ছায় আবার যেন পাই, তখন ক্লিয়ার শট।

    ReplyDelete
  6. এবারের এপিসোডে ককল্যাস ফিজেন্ট অবশ্যই প্রাধান্য বেশি পেয়েছে, কিন্তু গ্ৰীন টেলড সানবার্ড আর হোয়াইট কালার্স ব্ল্যাকবার্ডও কম কিসে। সব ফটোই ভাল হয়েছে। লেখা তো কোনো কমেন্টসের উর্ধে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাঙ্কিউ দাদা

      Delete
  7. খুবই উপভোগ্য। অনেক কিছু শিখতে পারা যায়। পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  8. bah khub bhalo ..... btw, pakhalinama 2 jodi hoe tabe chhi (photograph) saho hole bhalo hoe

    ReplyDelete
    Replies
    1. ওরে বাবা! ছাপতে কত লাগে জান? ছবি দিয়ে বই করা এ জীবনে হবে বলে মনে হপ্যনা।

      Delete

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...