পোথি পথিকরা
RUPANKAR SARKAR·MONDAY, 16 APRIL 2018
আর একটা ট্যুর শেষ
হলো। আমি
ফিরলেই জনা চল্লিশেক বন্ধু
তাকিয়ে থাকেন কবে ট্যুর
ডায়ারি পেশ করি।
হয়ত আমার তিন সহস্রাধিক
বন্ধু আছেন তালিকায়।
কিন্তু ২৯৬০ জনের চেয়ে
এই চল্লিশই আমাকে তাড়িত করে
কিছু একটা লেখার জন্য। ছাইপাঁশ
যা-ই লিখি, এঁরা
পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। তাই
তো ফেসবুকে আসা। গল্প
শোনার মানুষ পেলেই না
লোকে গল্প বলে।
আমার পাঠকবন্ধুরা জানেন প্রথাগত ‘ভোমোন
কায়িনি’ লিখিনা আমি।
তাই তুলে আনি নানা
রকম ছবি, জায়গার, মানুষের,
ঘরবাড়ির, আর বলি সেই
জায়গার কথা, কী দেখলাম,
আমার চোখ দিয়ে দেখাই
পাঠকদের। চিরাচরিত
পাখির ছবি তো থাকবেই।
তবে এই উপাখ্যান শেষ
হবে কিনা বলতে পারিনে। কারণ,
আর অল্প কদিন পরেই
হয়ত আবার বেরোতে হবে। যতদূর
পারি, মনোরঞ্জনের আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে,
এটা অঙ্গীকার। পারব
কিনা জানিনা।
নামকরণ
এ লেখার নামকরণ নিয়ে
একটা সমস্যায় পড়ছিলাম গোড়াতেই। খুব
পছন্দের নাম ছিল, ‘দা
মার্সেনারিজ’। কিন্তু
ভেবে দেখলাম, এই শব্দটির কিছু
মানহানিকর অর্থ আছে।
নিজের মানহানিতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে নেই, ‘মান’ থাকলে
হানির প্রশ্ন। কিন্তু
অপরের তো আছে।
আসলে ‘মার্সেনারিজ’ মানে ভাড়াটে সৈন্য,
যারা কোনও আদর্শের জন্য
লড়তে আসেনি, দেশপ্রেমের জন্যও
না, স্রেফ টাকার জন্য
জীবন বাজি রেখে লড়ে
যায় এরা, কেউ মরে,
কেউ জিতে ফেরে নিজের
দেশে, শুধু টাকার জন্যই। কিন্তু
আমার ভাবা মার্সেনারিজের অর্থ
অন্য। এখানেও
টাকার প্রশ্ন, রোজগারের নয়, বাঁচানোর।
ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে গেলে যা
খরচা, তার অনেক কমে
হয়ে যায় এমন দল
পাকানো ট্যুর। কিন্তু
মার্সেনারিজদের মতোই এক্ষেত্রে জড়ো
হন বেশ কিছু মানুষ,
যারা ‘হয়ত’ কেউ কাউকে
আগে চিনতেনই না। হলিউডের
‘দা মার্সেনারিজ’ নামে একটা ফিল্ম
হয়েছিল। দেখেছিলাম। তেমন
জমেনি। এখন
আবার এই নামেই অন্য
ফিল্ম হয়েছে, গল্পও আলাদা। কিন্তু
মোদ্দা ইস্যুটা হচ্ছে অপরিচিত কিছু
মানুষ জড়ো হয়েছে একটা
কমন গোল নিয়ে।
তা হল, পাখিবাজি করা
আর একত্রে গিয়ে টাকা
বাঁচানো। এই
দুর্মূল্যের বাজারে কয়েক হাজার
বাঁচানোও ছাড়ে কে?
যাই হোক, এ নামটা
খানিক মানহানিকর বলেই শিরোনাম পাল্টালাম,
‘পোথি পথিকরা’। কিন্তু
এমন অদ্ভুত নামের মানে?
ক্রমশ প্রকাশ্য বন্ধু। নিন
গল্প শুনুন। এ
গল্প শুরু তো করছি,
শেষ করতে পারব কিনা
বলতে পারিনে।
এই পর্যটন প্ল্যান করেছিলেন
‘ব’ বাবু। তাঁকে
আপনারা সবাই চেনেন, মানে
আমার লেখা যাঁরা নিয়মিত
পড়েন। পুরো
নাম নাই বা বললাম। তা
তিনি বললেন অমুক দিনে
গাঢ়ওয়ালের উদ্দেশে যাত্রা হবে, আপনি
কি যাবেন? আমি তো
ঘাড় নেড়ে দিলাম।
কিন্তু আর যাঁদের তিনি
ধরেছিলেন, তাঁরা দোনোমোনো করেই
যাচ্ছেন। তখন
তিনি বললেন, আপনার চেনা
আর কেউ যাবেন? তো
মনে পড়ল বিশ্বজিতের নাম। নতুন
পাখি নাড়াচাড়া করা শুরু করেছে
তখন। তা
সে বলল যাব, হলো
তিনজন। এবার
আর একজন হলে ভাল
হয়। মনে
পড়ল ডাক্তার কৌশিক মাইতির কথা। অতিশয়
সজ্জন , নির্বিরোধী, ভদ্র, খামখেয়ালি মানুষ। আমায়
বলেই রেখেছিলেন, দাদা, কোথাও গেলে
আমায় একবার জানাবেন।
তা তাঁকেই বললাম, যাবেন
নাকি? তিনিও রাজি।
এবার
‘ব’ বাবু বললেন, আমরা
প্লেনে দিল্লী যাব।
সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে
হরিদ্বার। আমরা
বললাম, কেন রে ভাই,
দিব্য উপাসনা এক্সপ্রেস ছাড়ে
হাওড়া থেকে। তা
তিনি বললেন, ওটা লেট
করে। তা
করুক না, আমরা তো
হরিদ্বারে এক রাত কাটাবই,
পরদিন ভোরে একটা গাড়ি
নিয়ে চলে যাব পাহাড়ে। তো
যত খুশি লেট করুক,
ক্ষতি কী? এবার তিনি
নেট চালাতে জানেন না,
তাই তাঁর টিকিট কাটে
ট্র্যাভেল এজেন্ট। আমি
বললাম, তা টিকিট বিশ্বজিত
কেটে দেবে। খামোখা
ট্র্যাভেল এজেন্টকে টাকা দেব কেন?
সবাই বিশ্বজিতকে টাকা পাঠিয়ে দাও। ডাক্তারবাবু
দিলেন, আমি সিউড়ি গেছিলাম,
ক্যাশই দিয়ে এলাম।
কিন্তু ‘ব’ বাবু এবার
বায়না ধরলেন, এসি ফার্স্ট
ক্লাসে যেতে হবে।
আমাদের তো পাগলা কুকুরে
কামড়ায়নি, তাই আমরা টু
টিয়ারেই যাব ঠিক করলাম। তখন
তিনি গোঁসা করে বললেন,
যাবেন না। তা
যাবেন না, বেশ।
আমরা তিনজনেই যাব। একেবারে
গোড়াতেই ট্যুরের উদ্যোক্তা নিজেই বেরিয়ে গেলেন। তা
বেশ।
বেশ কিছুদিন পরে শুনলাম আর
একজন যাবেন, ইনিও ডাক্তার,
অম্লান চৌধুরি। একদা
কেপিসিতে ডক্টর মাইতির জুনিয়র
ছিলেন পেডিয়াট্রিশিয়ান হিসেবে, কিন্তু দুজনে খুব
ভাব। তারপর
আরও একজন জুটে গেলেন,
হিমাদ্রি মণ্ডল। তাঁর
বিশ্বজিতের সংগে ফেসবুকে আলাপ,
যাবার কথা নাকি তখন
থেকেই। তারপর
আবার সিকেবিএস এ ছবি তুলতে
গিয়ে অম্লানের সঙ্গে আলাপ।
সেখানেও কথা হয়, ‘আরে!
আমিও তো যাচ্ছি’, তাই
যাওয়া কনফার্মড। পৃথিবীটা
গোল তা বিলক্ষণ বোঝা
গেল। তাই
অচেনা মানুষগুলো নানারকম সূত্রে চেনা হয়ে
গেল কাকতালীয়ভাবে। হলাম
আমরা পাঁচজন। কিন্তু
এত সব সত্বেও এই
পাঁচজনই যে আবার একসঙ্গে
কোথাও যাবে, প্রোবাবিলিটির অঙ্কে
লাখে বা কোটিতে কত,
তা আমার জানা নেই,
তবে ডাক্তার অম্লান আর কৌসিক
মাইতি যে একত্রে ভ্রমণ
করবেন তা নিশ্চিত, আগেও
করেছেন বহুবার।
মজার কথা হচ্ছে, এই
পাঁচজনই আলাদা করে দুজন
দুজন করে সহযাত্রীকে চিনতেন। আমি
চিনতাম বিশ্বজিত ও ডাক্তার মাইতিকে,
ডাক্তার মাইতি চিনতেন ডাক্তার
অম্লান চৌধুরি আর আমাকে,
অম্লান চিনতেন কৌশিক মাইতি
আর হিমাদ্রি কে, হিমাদ্রি চিনতেন
অম্লান আর বিশ্বজিতকে, বিশ্বজিত
চিনতেন হিমাদ্রি আর আমাকে।
যাক দুনিয়া গোল হ্যায়,
প্রমাণিত। তবে
সে ঘুরছে কিনা মিস্টার
কে সি পাল জানেন।
এই পাঁচজন আলাদা বৃত্তের
মানুষ একত্রে কমন গোল
নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন
বলেই শিরোনামটা অমন ভাবছিলাম।
তা যাকগে, পাল্টে করলাম
‘পোথি-পথিকরা’। কী
এর মানে? চলুন দেখব
খানিক পরে। নিজেরা
অ্যারেঞ্জ করলে মিসম্যানেজমেন্টে খানিক
অপচয় হয় বটে, তবে
তাও অপারেটেড ট্যুরের চেয়ে কম তো
বটেই। কিন্তু
যা হয়, ভবিষ্যতে আদৌ
একত্রে ট্যুরে যাওয়া হবে
কিনা দেবা ন জানন্তি। যাই
হোক চলুন ট্যুর কেমন
হলো দেখা যাক।
গোড়াতেই
গলদ এই ট্যুরের।
জানা গেল, দুপুরের ট্রেন
ছাড়বে রাত্রে। রাত্রে
মানে, মধ্যরাত্রে। এবার
ব্যাপারটা বিশ্বজিত মুখার্জি জেনেছে, সে আমায় ফোন
করে জানাল। আমি
ডাক্তার মাইতিকে ফোন করতে গেলাম,
নো রিপ্লাই। উনি
থাকেন মেদিনীপুরে, দুপুরের ট্রেন ধরবেন বলে
সাত সকালে বেরিয়েছেন।
ফোন হয়ত ব্যাগের মধ্যে। যখন
পেলাম তাঁকে, ততক্ষণে তিনি
হাওড়ায় পৌঁছে গেছেন।
বললাম আমার বাড়ি চলে
আসুন, তা তিনি হাওড়াতেই
একটা হোটেলে উঠে পড়লেন।
আমি কিন্তু মনে মনে
উল্লসিত। কারণ
যাবার সময়ে ঝামেলা হলেই
বার্ডিং সুষ্ঠুভাবে হবে, এমনটা দেখেছি
কয়েকবার। ফোরকাস্ট
ছিল, আমাদের গাঢ়ওয়ালে থাকাকালীন
রোজই প্রবল বৃষ্টি হবে। আমি
মনে মনে বললাম, কিস্যু
হবেনা, ট্রেনে গোলোযোগ তাই
কাটাকুটি হয়ে গেল।
রাত্রে
হাওড়ায় পৌঁছে শুনি, ট্রেন
আবার পিছিয়েছে, এখন ছাড়বে আরও
দেড় ঘন্টা পরে, মানে
রাত সাড়ে বারোটায়।
বড় ঘড়ির নীচে অপেক্ষা
করার ছিল, আমরা সেখানেই
দেখা করলাম। কৌশিকবাবু
খবরের কাগজ কিনে এনেছেন,
আমরা মাটিতেই বসে পড়লাম।
তাঁর তো মাথায় হাত,
এই দেখুন।
(চলবে)


দারুন শুরু ৷ এবার গাড়ি গড়গড়িয়ে গড়াক ৷
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDeleteএখানে এলাম এবার। পড়ি।
ReplyDelete