পোথি পথিকরা – ৭
আচ্ছা,
এই যে ‘পোথি পথিকরা’
নামে এই কাহিনী, এমনকি
ব্লগের নামও ‘পোথি পথিক’,
কী অর্থ এই অদ্ভুত
নামের? এ কি বাংলা,
উর্দু, সংস্কৃত? আচ্ছা ধরা যাক,
কোনও একটা ভাষায় কিছু
একটা মানে আছে এর। কিন্তু
এ লেখা তো শেষ
হবে একদিন না একদিন। ব্লগের
নাম তো থেকেই যাবে। তাতে
এসে জুটবে অন্য কোনও
লেখা। তবে?
আসলে এ নামটা কিছুটা
ধ্বনিগত সাদৃশ্যের জন্যই ব্যবহার করা
হয়েছে। অর্থও
একটা আছে নিশ্চয়।
এমন তো কোনও কথা
নেই, যে বিশেষ কোনও
ভাষার আশ্রয় নিয়ে কোনও
নামকরণ হলে তা পরে
আর ব্যবহার করা যাবেনা।
আর থাকলেও তা আমি
বিশেষ গ্রাহ্য করিনা। এ
নামের অর্থ প্রকাশ হবে
অচিরেই, আর কয়েক পর্বের
পরেই। তখন
মলাটও বদলে যাবে, একটু
বিস্তৃত হবে, ইংরিজি অর্থ
সমেত।
আমরা সারিগাঁও পৌঁছনোর আগে পথে আরও
কিছু ঘটনা ঘটেছে।
আমরা দলে ছিলাম পাঁচজন। একটা
‘এসইউভি’ (স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকল)এ, আসনের
বিন্যাস এরকম, চালকের পাশে
একজন বসতে পারে, মাঝের
আড়াআড়ি আসনে তিনজন, আর
পেছনের লম্বালম্বি আসনে দুপাশে দুজন
করে। স্বভাবতই
চার জনের দল হলে
কাউকে আর পেছনে বসতে
হয়না। কিন্তু
আবার পাঁচজনের দল হওয়াতে খরচাপাতি
স্বাভাবিক নিয়মেই পাঁচভাগ হয়েছে। নইলে
এ অঞ্চলে ভ্রমণ বেশ
খরচ সাপেক্ষ। তা
আমাদের এই গাড়িতে হরিদ্বার
স্টেশনে মালপত্র তোলার সময়েই পেছনে
সব তুলে দেওয়া হয়েছে। একেবারে
দরজার কোল ঘেঁষে একটি
আসনে এক কোণে একজন
কোনওমতে বসতে পারে।
এখন কথা হলো, কে
বসবে সেখানে। বিশ্বজিত
আমাদের দলপতি। সে
ফরমান জারি করেছে প্রথমেই,
আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, তাই আপনি আগাগোড়াই
প্রথম সিটে, ড্রাইভারের পাশে
বসবেন। কখনও
যেন না শুনি, ‘আমিও
শেয়ার করে মাঝে মাঝে
পেছনে যাব’। যা
শেয়ারিং, আমরা বাকিরা করব। তাই
আমি বাধ্য ছেলের মতো
চালকের পাশের আসনে বসলাম। এই
আসনটি বেশ আকর্ষণীয় হওয়ায়,
অন্য সব ট্যুরে, বিশেষত
দীপঙ্করের আয়োজিত সফরে, নানারকম
ইমোশনের খেলা দেখা যায়। আমি
কখনও কোথাও তেমন দাবি
জানাইনা, খুব ছেলেমানুষি মনে
হয়। যেখানে
ঠাঁই পাই, সেখানেই বসে
যাই। বুঝতে
পারি অনেক কিছুই, কিন্তু
আমার চোখ অর্জুনের, অর্থাৎ
মাছের বদলে পাখিতে।
অন্য কোনও জাগতিক
ব্যাপারে নজর দিতে আমার
বয়েই গেছে।
কিন্তু
এখানে দলপতির কড়া নির্দেশ,
আমি আর কী করি,
একগাদা সঙ্কোচের পাহাড় নিয়ে সেখানেই
বসলাম। এবার
মাঝে তিনজন। একেবারে
শেষের সিটে কে বসিবেক?
একজনই আছে, ‘নিঃশেষে প্রাণ
যে করিবে দান’...ইত্যাদি
। তার নাম
ডাক্তার কৌশিক মাইতি।
সে তড়বড়িয়ে চলে গেল পেছনে। আর
বলল রোটেশন ফোটেশনের দরকার
নেই, আমি এখানেই বসব।
প্রথম
প্রথম ঠিকই ছিল।
আগেই বলেছি, ইনিশিয়াল স্টেজে
এ পাহাড়ে বাঁক কম,
গাড়ি সোজাই যায়, আর
বেশ গতিতে। কিন্তু
ওপর দিকে উঠতে প্যাঁচের
পর প্যাঁচ শুরু হতেই
ডাগদরসাব বলেন, আমার যে
গা গুলোচ্ছে, কেউ একজন কিছুক্ষণ
আসবে? গেল অন্য ডাক্তার,
অম্লান। অল্প
সময় পরেই তার শুধু
গা গুলোনো নয়, বমিই
আরম্ভ হয়ে গেল।
এবার হিমাদ্রি, সেও রণে ভঙ্গ
দিল খুব অল্প সময়
পরেই। দলপতি
বিশ্বজিত ঘোষণাই করে দিল,
ওরে বাবা, আমার ওখানে
গেলেই ইয়ে হয়।
মানে শুধু বমি নয়,
বাহ্যেও পেয়ে যায়।
অগত্যা এই বুড়ো।
আমি বললাম, আমার বমি
টমি কিস্যু হবেনা, আমিই
বসব ওখানে। তাই
রেস্ট অফ দা জার্নি,
আমিই ব্যাকবেঞ্চার। অম্লান
বলল, আপনার কিচ্ছু হচ্ছেনা?
নমস্য মানুষ আপনি।
আমি বললাম, ভায়া, শুধু
ফুসফুসটা বেকার হয়ে গিয়ে
আমি হ্যান্ডিক্যাপড হয়ে পড়লাম গত
তিন বছরে। নইলে
শারীরিক যে কোনও ক্ষমতায়
আমি যুবকদেরও মহড়া নিতে প্রস্তুত। আসলে
সেই ছোট্ট বেলা থেকে
রেলগাড়ি আর হাওয়া গাড়িতেই
আমার জীবন কেটেছে।
আমার কিছুতেই কিছু হয়না।
কাল যে দুজন যুবকের
মর্মান্তিক পরিণতির কথা বললাম, তারা
ছিল বাইকে আরূঢ়।
তাদের ওপর ভেঙ্গে পড়ল
গোটা পাহাড়। একের
পাপের বোঝা অন্যকে বইতে
হয়। যারা
এই কোটি কোটি বছরের
জমা পাথর কেটে ফেলার
হুকুম দিল, তাদের মাথায়
পড়লনা। কী
প্রয়োজন এখানে সিক্সলেন বা
ফোর লেন বানানোর? কত
শত বছর ধরে মানুষ,
মানে ধর্মপ্রাণ মানুষ তীর্থ করতে
গেছেন এই পথে।
কারও কিছু অসুবিধে হয়েছে?
কেদারে অফিশিয়ালি দশ হাজার মানুষ
মারা গেছিলেন ড্যাম বার্স্ট করে
ফ্ল্যাশ ফ্লাডে। একদিন
আবার কিছু হবে।
মরবে নিরপরাধ লোক। এটাই
নাকি ভগবানের নিয়ম। ও
নিয়মের কাঁথায় আগুন।
সন্ধে
নাগাদ আমরা এসে গেলাম
সারি গাঁও। সেই
যে নেচার রিসর্ট না
কি একটা জবরদস্ত নাম,
আগে বলেছি। আসলে
ছোট্ট হোটেল। বেশ
কোজি। আমি
ডাক্তারদের ঘরে ঠাঁই পেলাম। অম্লান
নিজে হাতে লেপ কম্বল
পেতে আমার বিছানা করবে। বয়স
যাই হোক, সে একজন
প্র্যাক্টিসিং স্পেশালিস্ট ডাক্তার। কোনও
কথাই শুনবেনা। আমায়
দাবড়ে দিল। নিজে
হাতে লেপ সরিয়ে অন্য
কুইল্ট নিল। বলল,
এটা কেমন ভেজা ভেজা। নীচে
একটা, ওপরে একটা, চাদর
পেতে টান টান করে,
বলল, রূপঙ্করদা, বেড রেডি।
রাতে সিম্পল ভোজন কিন্তু
টেস্টি। সকালে
উঠে দেওরিয়া তাল গমন।
এই যে, সারি গাঁও।
সঙ্গীরা
‘দেওরিয়া তাল’ অভিযানে গেলেন। জঙ্গলের
মাঝে এমন রাস্তা দিয়ে
গেলেন, যা চার পাঁচটা
স্টেপ উঠেই বুঝলাম, এ
আমার কম্মো নয়।
ফুসফুস জানান দিচ্ছে।
অবশ্য পরে জেনেছি, দেখেছিও,
যে অন্য রাস্তা ছিল। তাতে
খানিকতা উঠতে পারতাম।
যাই হোক, আমি ফিরে
এসে, ক্যামেরা বগলে সার্ভে করতে
বেরোলাম।
মেঘের
কোলে মেঘ হেসেছে বাদল
গেছে টুটি।
আমি কোনদিকে যাই, ইতিস্তত ঘোরাঘুরি
করছি। একজন
স্থানীয়কে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই পাখি
টাখি পাওয়া যায়, এদিকে?
তিনি বললেন, হ্যাঁ ওই
তো বাঁদিক ধরে চলে
যান, লোকালয় ছাড়িয়ে একটু
পরেই জঙ্গল শুরু হবে। সেখানে
অনেক পাখি।
আচ্ছা
তার আগে আমি ওপরের
ছবিটেই একটু বড় করে
দেখাই। পাঠক
বন্ধুরা ছবিটায় ক্লিক করলেই
বড় করে দেখা যাবে। এই
বাড়িটা এখানকার ট্র্যাডিশনাল বাড়ি। এখানকার
বলতে এদিকের পাহাড়ের ।
কুমায়ুনে এমন বাড়ি একেবারে
দুর্গম জায়গায় থাকতে পারে,
গাড়ির রাস্তার ধারেকাছে দেখিনি। গাঢ়ওয়ালে
কিছু দেখেছি। এর
দেওয়াল তৈরি হয় পাথরের
ওপর পাথর সাজিয়ে, নো
সিমেন্টিং। সিমেন্টিং
মানে কিন্তু ‘সিমেন্ট’ দেওয়া নয়।
সিমেন্টিং মানে আটকে রাখার
কোনও উপাদান ছাড়াই।
তেমন বাড়ি দেখাব শেষের
দিকে। এটায়
সেই দেওয়ালের ওপর একটা মাটির
প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
এটাও সবক্ষেত্রে দেওয়া হয়না।
সবচেয়ে বড় কথা এ
গৃহের ছাদ তৈরি হয়
চ্যাটালো ও পাতলা পাথরের
ওপর পাথর সাজিয়ে।
চারিদিকে প্রকৃতির সঙ্গে কী সুন্দর
খাপ খেয়ে যায়।
এমন জনবিরল জায়গা বলেই
এখনও টিকে আছে।
কদিন পরে ‘উন্নয়নের’ জোয়ার
এলেই নীল, বেগুনি, গোলাপি
সব ইট কাঠ মর্টারের
বাড়ি বানানো শুরু হয়ে
যাবে।
এই সেই ছবি।
এ বাড়ি পেরিয়ে, খানিক
যেতেই একটা ঝোপের মধ্যে
থেকে বড় সুমিষ্ট আওয়াজ
ভেসে এল। মন
দিয়ে সুরেলা গান গাইছে
কোনও পাখি। আসলে
পাখির গান মানেই ‘মেটিং
কল’ আর তা গায়
পুরুষ পাখিরাই। পাখিদের
সমাজে ধর্ষণ টর্ষন নেই। শরীরের
রঙের বাহার, গলায় সুরসপ্তকের
খেলা, এই সব দিয়ে
যদি স্ত্রী পাখির মন
জয় করা যায়, তবে
মিলন হবে। কোনও
পুরুষ পাখি সে চেষ্টাতেই
রত। আওয়াজে
বুঝলাম এ হচ্ছে ‘চেস্টনাট
হেডেড লাফিং থ্রাশ’।
লাফিং থ্রাশ হচ্ছে এক
জাতের পাখি, যাদের পরে
আবার কিছু দেখাব, তারা
খ্যা খ্যা খ্যা করে
হাসির মতো আওয়াজ করে। তবে
তারা সবাই শুধু হাসে
না, কেউ কেউ গানও
গায়। আর
তা বেশ মিষ্টি গান।
অনেক খুঁজে বাবুমশায়ের সন্ধান
পেলাম। তবে
বেশ অন্ধকারেই ছিলেন তিনি।
আরও এগোতে লাগলাম, বেশ
কিছু দূরে গাছের মগডালে
নড়াচড়া। ক্যামেরা
তাক করে দেখি, একটা
‘কমন রোজ ফিঞ্চ’, পুরুষ। ভাবলাম
একটা যখন পেলাম, আরও
নিশ্চয় পাব। এগোই
তাহলে।
(চলবে)





চমৎকার। পাখির ছবি খুব সুন্দর। হিমালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ এখনও সুন্দর। কিন্তু আপনার কথা শুনে ভয় লাগে আর কদিন এই সুন্দর পরিবেশ আর পাখি থাকবে।যে কদিন আছে,দেখি। আপনার চোখ দিয়েই দেখি যতদিন না নিজে যাচ্ছি।
ReplyDeleteগেলে সত্বর যেতে হবে। নইলে অচিরেই এ জায়গা কালিঘাট বা ভবানীপুর হয়ে যাবে।
Deleteদাদা একটু সংযোজন করি।কৌশিক বাবুর পরে অম্লান বসেছিল।তার ভীষণ গা গুলিয়ে উঠতে তারপর আমি গেছিলাম।আমি স্লিপার ক্লাসে হরিদ্বার গেছিলাম।আর কোচে জল ছিল না।তাই প্রাতকৃত্য সারা হয় নি।পিছনে বসে একটু যেতেই এমন পেট মোচড়াতে লাগলো যে রণে ভঙ্গ দিলাম।হিমাদ্রি কে আর পিছনে যেতে হয় নি।আপনি প্রায় জোর করেই পিছনে গেলেন আর আশ্চর্য ব্যাপার যে আপনি এইসব ব্যাপারে একদম ফুলপ্রুফ। আসার সময় ছাড়া বাকি সবসময় তাই back bencher হয়েই রইলেন।ধন্যি stamina
ReplyDeleteও, তিন নম্বরটা গুলিয়েছি তাহলে।
Deleteঅফিসে কাজের ফাঁকেই পড়ে নিলাম। চলছি...
ReplyDeleteসঙ্গে থাকুন
Deleteসারি গ্রামের অধিবাসী দের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম ঐ ছাদ তৈরির পাথর গুলো মাটির নিচ থেকে বড় পাথর তুলে তারপর তা থেকে পাতলা করে কেটে কেটে বার করা। এই ধরনের পাথর চেনা এক বিশেষ ধরনের কৌশল । এই কৌশল জানা বিশেষজ্ঞ আর মাত্র কয়েকজন আছেন, তাও তাঁরা বয়স্ক। বর্তমানে এই কৌশল নতুন কেউ শিখতে চাইছে না। তাই হোম স্টে গুলো আধুনিক মতে বানানো।
ReplyDeleteঐ গ্রামে একটি বাড়ি দেখেছিলাম যেটা শতাধিক বছরের পুরানো। দরজা এবং জানালায় অদ্ভুত সুন্দর কারুকাজ করা।
খুব ভাল লাগল এই অভিজ্ঞতার কথা। আপনার মন্তব্য সঙ্গে থাকলে তা 'সম্পদ' বলে গণ্য হবে।
ReplyDeleteএইরকম বাড়ি দেখেছি। পাহাড়ের ছোট ছোট গ্রামে দেখা যায়। যেখানেই জেনেগেন দলে দলে যান, সেখানে লাল, নীল, হলুদের রাজত্ব।
ReplyDeleteরাস্তার ধারে দুটো চারটে বাড়ি, একটা ছোট্ট দোকান, একপাশ দিয়ে কুলকুল করে নদী বইছে এরকম বাড়ির কাছ দিয়ে, আগে খুব দেখতে পেতাম। ছাদে ভুট্টা শুকোনো হচ্ছে, দুটো বাচ্চা চুপ করে বসে আছে রাস্তার পাশে, খুব স্বাভাবিক দৃশ্য ছিল।
এগোচ্ছি ... এটা detail যে 'সাথে আছি' কথাটা ক্লিশে শোনাচ্ছে .....
ReplyDeleteহোক না ক্লিশে। কথা তো সীমাবদ্ধ। একদিন না একদিন সব কথাই ক্লিশে হয়। ভাবুন তো, দুই নর-নারী যে তিনটি শব্দ আদানপ্রদান করছে সভ্যতার আদিযুগ থেকে, তা কি ক্লিশে হয়েছে?'
Deleteছবি অনিন্দ্যসুন্দর!! বড় ভালো লাগছে। পড়ছি।
ReplyDeleteথ্যাঙ্কিউ।
Deleteদারুন।
ReplyDeleteথ্যাঙ্কস।
Deleteহ্যাঁ, নো সিমেন্টিং একেবারেই। আগে অনেক ছিল। আর কয়েক বছর পরে কিছুই তজাকবেনা।
ReplyDelete