পোথি পথিকরা – ৫
প্রিয়
পাঠক,
এতদিন
ফেসবুকে লিখছিলাম। লিমিটেড
রীডারশিপের জন্য। সে
কারনে লেখায় কিছু প্রগলভতা,
কিছু হালকা চাল, কিছু
অনবধানতা। যেই
ব্লগে ঢুকলাম, ব্যাপারটা গম্ভীর হয়ে গেল। এখন
থেকে কেতাবি ভাষাতেই থাকবে
লেখা। কত
মানুষ এ লেখা পড়ছেন,
তা দেখা যায় যে।
গাড়োল দের দেশে।
আমরা ছেলেবেলা থেকেই একটা শব্দ
শুনে অভ্যস্ত, ‘গাড়োল’। আমাদের
বাল্যকালে গালাগাল ছিল খুবই সীমিত। বাংলায়
যৌনগন্ধী যে সব গালিগালাজ
এখন মুড়িমুড়কির মতো উচ্চারিত হয়,
তাদের মধ্যে একটি মাত্র,
যেটি ‘খ’ অক্ষর দিয়ে
শুরু, সেটি দক্ষিণ চব্বিশ
পরগণায় উদ্ভূত বলে আন্দাজ। বাকি
সব কটিই বিহার থেকে
আমদানি হয়েছে। সেকালে
বিহারিরা কলকাতায় ছিলেন বটে, তবে
সংখ্যায় তাঁরা এত বিপুল
ছিলেন না। আর
কেবলমাত্র ঠেলা, রিক্সা, কুলি,
মজুর হিসেবে কিছু অনুসূচিত
জাতির মানুষ, কিছু গোয়ালা
ও দারোয়ানি আর রান্নার কাজে
কিছু ব্রাহ্মণ। তাই
বিহারি গালাগাল তেমন ছড়ায়নি বাংলায়
তখনও। বস্তির
লোকের মুখেও গালাগাল ছিল,
‘ড্যাকরা’, ‘ওলাউঠো’, ‘মুখপোড়া’, ‘আটকুঁড়ের ব্যাটা’(এটির মর্মার্থ যথেষ্ট
সুদূরপ্রসারি হলেও, বাহ্যত নিরামিষ)। ভদ্রসমাজে
গালাগাল যা যা ছিল,
তার তালিকা দিয়ে লাভ
নেই, কেবল ‘গাড়োল’ তাদের
মধ্যে একটি, এটুকু বলা
যায়।
সম্ভবত,
এই ‘গাড়োল’ শব্দ ‘গাঢ়ওয়াল’
বা সহজ বাংলায় ‘গাড়োয়াল’
শব্দের অপভ্রংশ। একটা
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে গাঢ়ওয়াল প্রদেশের
বহু মানুষ কিছু কিছু
বাংলা শব্দ জানেন।
একটা উদাহরণ দিই, আমাদের
যাত্রাপথের মাঝে এক অনামি
জায়গায় একটি ছোট জনপদে
এক চায়ের দোকানে আমাদের
গাড়ি দাঁড়িয়েছে। এদিকে
বিকেলের আলো পড়ে আসছে,
আর ক্ষণে ক্ষণে আকাশের
ভোল পাল্টায় বলে আমরা উদ্বিগ্ন,
কত তাড়াতাড়ি চা খেয়ে আমরা
আমাদের পাখিবাজিতে লেগে পড়ব আবার। আমি
ছিলাম বেশি ছটফটে, বললাম
‘কই গো, দোকানদারকে একটু
তাড়া দাও, কতক্ষণ লাগাবে
রে বাবা’। ওপাশ
থেকে দোকানদার বললেন, ‘হচ্ছে, হচ্ছে’।
আমি অবাক। যে
পথে বাঙালি ট্যুরিস্ট দলে
দলে যায়, সে পথের
স্থানীয় মানুষ কিছু বাংলা
শব্দ সংগ্রহ করে ফেলেন
ঠিকই। কিন্তু
এ তো সাধারণ ভ্রমণ
ম্যাপের রাস্তা নয়, নিতান্তই
আমাদের মতো পাখিবাজদের চলাচলের
পথ। তাও
একটি ছোট্ট জনপদ, যেখানে
তেমন কিছু সমৃদ্ধি নেই। তাহলে?
আসলে বংশ পরম্পরায় এঁরা
বাঙালি দেখেছেন এ অঞ্চলে তীর্থ
ও ভ্রমণের কারণে। এক
সময়ে, মানে মাত্র কয়েক
দশক আগেই, ভ্রমণ ব্যাপারটা
বাঙালির একচেটিয়া ছিল, তীর্থে কিছু
অন্য ভাষার মানুষ এলেও। আর
ভারতের অন্যান্য তীর্থে মানুষ গেলেও
কেদার-বদ্রি যাননি এমন
মানুষ খুবই কম।
তার কারণ তীর্থ ভ্রমণের
পাশাপাশি অপার সৌন্দর্য দর্শন। সারা
ভারতের সব পাহাড় ক্লেদাক্ত
উন্নয়নে কুৎসিত হয়ে গেলেও
গাঢ়ওয়াল এখনও সুন্দর, খুবই
সুন্দর। তাই
এই দোকানদার নিজে অথবা তাঁর
পূর্বজ কেউ হয়ত সাধারণ
ভ্রমণপথের কোথাও ছিলেন আগে। হতেই
পারে, সে সব জায়গাতেই
তো শুধুমাত্র জনবসতি ছিল এককালে। আর
এই পাহাড়ের সহজ মানুষগুলো হয়ত
এতই সরল ছিলেন, যে
ফুটানি বাঙালিবাবুদের কাছে তা ছিল
বোকামির সামিল। তাই
গাড়োয়াল থেকে সোজা কথায়
‘গাড়োল’, যা কালক্রমে দাঁড়িয়েছিল
গালিতে।
আর একটি মত হচ্ছে,
কিছু বাঙালি নাকি এদিকে
এসে আর ফিরে যাননি। গাঢ়ওয়াল
প্রদেশের জগদ্বিখ্যাত এনভায়রনমেন্টালিস্ট, ‘চিপকো’ মুভমেন্ট খ্যাত
সুন্দরলাল বহুগুণা। কিছুকাল
আগে জানা গেল, তাঁরা
এককালে বাঙালি ছিলেন এবং
পদবি ছিল চট্টোপাধ্যায়।
ফের যদি লিঙ্ক চান,
আমি অপারগ। খবরের
সোর্স দিতে পারবনা তবে
সংবাদপত্রেও লেখা হয়েছিল, এটুকু
বলতে পারি। সুন্দরলালের
মতো আরও অনেক বাঙালির
পরিবারই গাঢ়ওয়ালের প্রকৃতিকে আপন করে নিয়েছিলেন,
এমনটা শোনা যায়।
তাই টানা বলতে না
পারলেও ভাঙা ভাঙা দু
চারটে বাঙালি জুবান এখনও
তাঁদের মুখে।
আমরা উঠছি গাঢ়ওয়ালের রাস্তা
ধরে। দুধারের
সৌন্দর্য বলে বোঝানো সম্ভব
নয়। তাও
একটু বলি। ১৯৭৮
সালে আমি উটাকামন্ড বা
উটি গেছিলাম কয়েক বন্ধুর সঙ্গে। এখনকার
নাম ‘উদাগামণ্ডলম’। তখন
পাহাড়ে ওঠার সময়ে যা
দৃশ্য দেখেছিলাম, তাতে মন ভরে
গেছিল। ভেবেছিলাম
স্বর্গ একেই বলে।
দীর্ঘকাল পরে, বছর পাঁচ
ছয় আগে যখন আবার
গেলাম, গাড়ির জানলা দিয়ে
বাইরে তাকিয়ে বিতৃষ্ণায় মন
তেতো হয়ে গেল।
ছিঃ এই দেখার জন্য
এলাম! পৃথিবীর সব সুসভ্য দেশে
যত্র তত্র প্রকৃতি ধ্বংস
করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তা এসব বানানো হয়না। নগরায়ন
হয় কোনও কেন্দ্র জুড়ে। এই
গাঢ়ওয়ালের পাশের অঞ্চলই কুমায়ুন। সেখানে
বহুবার এসেছি। কিন্তু
দু এক বছরের তফাতে
গেলেই আঁতকে উঠি, পাহাড়
জুড়ে লাল-নীল-বেগুনি
বাড়ি আর দোকান দেখবার
জন্য এত পয়সা ও
পরিশ্রম খরচ করে আসব?
সিকিমে গিয়েও একই অবস্থা। যে
জায়গায় আগে একবার আসা
হয়েছে, পরের বারেই মন
বিষিয়ে যাচ্ছে। গাঢ়ওয়ালে
আমি আগে আসিনি কোনওদিন। এবারে
এসে ভাবছি, এখনও যে
এত সুন্দর, তার এক দশক
কি দুই দশক আগে
কেমন রূপ ছিল? কিছু
ছবি দেখাই আপনাদের,
এটি মন্দাকিনী নদীর ধারের একটি
দৃশ্য
এটি মাঝপথে কিছু যান্ত্রিক
গোলযোগে গাড়ি দাঁড়িয়েছে।
পাথরে বসে ফেসবুক করছে
বিশ্বজিত মুখার্জি। কোমরে
হাত ডাক্তার কৌশিক মাইতির।
আঙুল তুলে কোনও পাখি(সম্ভবত) দেখাচ্ছে হিমাদ্রি মণ্ডল। আর
সামান্য ইন্দ্রলুপ্ত নিয়ে তা দেখছে
ডাক্তার অম্লান চৌধুরি।
এটি আজকের শেষ ছবি। শ্রীনগরের
আসপাশ থেকে নীচের দৃশ্য। এছবি
দেখেই বোঝা যাবে গাঢ়ওয়াল
এখনও কত সুন্দর
(ছবিগুলোর
ওপরে ক্লিক করলেই ছবি
বড় করে দেখা যাবে)
(চলবে)



ঈশ্বর থাকলে তাঁর কাছে প্রার্থনা আমাকে গাড়োল করে দাও হে!
ReplyDeleteআমারও একই
DeleteLink to the article on Sundarlal Bahuguna:
ReplyDeletehttp://www.telegraphindia.com/1110313/jsp/calcutta/story_13704827.jsp
এখানে বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছে। আমি চট্যোপাধ্যায় পড়েছিলাম। যাই হোক ওঁর পূর্বপুরুষ ও আরও অনেকেরই, তা জানা গেল।
Deleteখুব প্রিয় গালাগালি ... ভাই-ভাস্তেদের এন্তার দেই ..... এখন তো নিজেই হতে ইচ্ছে হচ্ছে .... 'গাড়োল'....😂
ReplyDeleteসেটাই
Deleteঅসাধারণ সব ছবি। মন ভরে গেল।
ReplyDeleteথ্যাঙ্ক ইউ।
DeleteThis comment has been removed by the author.
Deleteছবিগুলো দারুন। লেখাটার কথা আর বললাম না।
ReplyDelete