Wednesday, 25 April 2018

পোথি পোথিকরা - ১০

পোথি পোথিকরা - ১০


সারিগাঁও



সারিগাঁও একটা স্বর্গীয় জায়গা। আজ থেকে বহুকাল আগে, উনিশশো পঁয়ষট্টি সালে আমি কালিম্পং গেছিলাম। আজ যদি কেউ সেখানে যান, আমি কী দেখেছিলাম, তা তাঁকে বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব। তখন আমি কিশোরমাত্র। মাসখানেক ধরে সারাদিন পথে পথেই ঘুরতাম। অদ্ভুত সব জঙলি গন্ধওয়ালা বিশাল বিশাল গাছ, হাজারো বুনোফুল আর রঙবেরঙের প্রজাপতি, আর মেঘের বিচিত্র খেলা, ক্ষণে ক্ষণে ভোল বদল দেখে দেখে আমার দিন কাটত। ক্ষিদে পেলে কালিম্পঙ বেকারির কালো বাক্স মাথায় মানুষটার থেকে কিছু কেক-পেস্ট্রি কিনে খেয়ে নিতাম। মজার কথা, তা কিন্ত সে সময়ে কলকাতাতেও পাওয়া যেত, ওইরকমই কালো ট্রাঙ্ক মাথায় নিয়ে ফেরিওয়ালারা হাঁটতেন কলকাতার পথে। যাই হোক, সেই পথে পথে ঘুরেই আমার বিকেল নামত। এক দূর সম্পর্কের দাদা ছিলেন বনদপ্তরের বড় অফিসার, বেশ কিছুটা উচ্চতায় তাঁর কোয়ার্টের গিয়ে সমবয়স্ক ভাইপোর সঙ্গে টেবল টেনিস খেলে, মায়ের বয়সি বৌদিদির হাতে গাজরের হালুয়া খেয়ে সন্ধের জোনাকিদের সঙ্গে খেলতে খেলতে পাহাড়ের মাথায় দুরপিনের গুপ্তাকোঠিতে ফেরা। এখন অবশ্য সে পাহাড়ের পুরোটাই আর্মি ক্যাম্প। গুপ্তাকোঠি কবেই চলে গেছে তাদের জিম্মায়।


এদিন সারিগাঁওতে এসে সেই অনুভূতিই ফিরে এল আবার। না, গাছগাছালি মোটেই তেমন নয়। তবে বুনো ফুলের ছড়াছড়ি। আর বহু রঙবেরঙের পাখি। বাঙালি পর্যটক জায়গাটার শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করার আগে কেউ একবার ঘুরে আসতে পারেন। শীতের শেষাশেষি গেলে ভাল করবেন। আরও কিছু পাখি থাকবে সে সময়ে। যাঁরা দেওরিয়াতাল যাবেন না, তাঁরাও যেতে পারেন। যাঁরা যাবেন, তাঁদের তো যেতে হবেই।


আমি ফিরে আসছিলাম আমাদের অস্থায়ী আবাসের দিকে। ওরা যে সেই ওপরে গেল, এতক্ষণেও কি ফেরেনি? এসে দেখলাম, কারও দেখা নেই, শুনলাম ওপরে উঠলে নামতে সময় লাগে। তার ওপর পাখিবাজদের দল গেছে। নিশ্চয় দারুণ দারুণ সব পাখির ছবি তুলছে। ভাবলাম একটা চা টা খেয়ে আবার যাত্রা করি, কিংবা বীরভদ্র সিং নেগি কে জিজ্ঞেস করেই দেখি আর কোনও দিকে পাখিটাখি মেলে কিনা। তা এসে দেখি ঘরদোর তালাবন্ধ, ধারেকাছে জনমনিষ্যি নেই। তাহলে অন্য কোনও দিকে যদি নাই যাই, পড়ে রইল একটাই অপশন, সেই ‘ভয়ঙ্কর’ কুকুরের পাহারা দেওয়া রাস্তায় আবার যাওয়া। বার বার নেপালি রক্ষক এসে নাও বাঁচাতে পারেন।


তা ভাবলাম কুকুর অবধি না গেলেও ওদিকপানেই হাঁটি, শুধু পাখি নয়, বড় সুন্দর কিছু দৃশ্য দেখা যায় ওদিকে গেলে। খানিক হাঁটতেই সেই জায়গা, যেখানে সেই ‘লাফিং থ্রাশ’ বিকট স্বরে হাসাহাসি না করে সুরেলা গান গাইছিল এদিন সঙ্গিনীর মন ভোলাতে। তাকে খোঁজাখুঁজি করে ঝোপের গভীরে উঁকি মারতেই বেরিয়ে এল এক বড় সুন্দর পাখি, যার ছবি আমি এর আগে অনেক চেষ্টাতেও তুলতে পারিনি। কেন পারিনি তার কারণ আর তার ক্লোজ আপ ছবি দেখাব পরের কোনও পর্বে। পাখির নামও তখনই বলব।



বুনোফুল আমার ভীষণ পছন্দ। যে সব জায়গায় ‘সভ্য’ মানুষের পদচিহ্ন কম পড়েছে, সেখানে এদের দেখা যায় বেশি। আসলে সব ফুলই একদা ‘বুনো’ ছিল। পরে তা লালিত পালিত হয়ে নানাধরণের কৃত্তিম সার টার খেয়ে অন্য চেহারা ধরে। এককালে আমাদের এই কলকাতার বসতবাটিতে বুনো গোলাপও ছিল। একই গাছে সাদা, গোলাপি ও লাল ফুল ফুটত থোকায় থোকায়। যাক সে কথা, মার্কিন দেশ থেকে বিশ্বযুদ্ধের সময়ে চলে আসা আগাছা ‘ল্যানটানা’, যাকে বাঙালিরা অনেকে ‘পুটুস’ ফুল বলেন, পাঁচতারা হোটেলের কেয়ারিতে ঢুকে তারই কী রূপ, দেখে আমি থ হয়ে গেছিলাম।

এখানে অজস্র বুনোফুল। নীচে দেখাই একটিকে।



এ ফুলটি বুনো কিনা জানিনা, বড় গাছে হয়। সাধারণত বুনোফুল হয় ঝোপেঝাড়ে। তবে অন্যত্র আমার চোখে পড়েনি। হয়ত খুব সাধারণ কিছুই, কিন্তু আমি খেয়াল করিনি আগে।



এ ফুল অবহেলায় পড়ে থাকে পথের ধারে। মানুষে, ঘোড়ায়, পদদলিত করে চলে যায়। অথচ তুলে এনে যত্ন করলে এ-ই কী খোলতাই হতে পারে।




হাঁটিতে হাঁটতেই চোখে পড়ে যায় জুম চাষের ক্ষেত। এখানে দুরকম ধান হয়। প্রসঙ্গত গাঢ়ওয়ালে ‘ধান’ কে ধান-ই বলা হয়। এখন যেটির বীজ ফেলা হচ্ছে, আমাদের সমতলের মতো ‘বীজতলা’ এঁরা করেন না বোধহয়, এখন যেটি ফেলা হচ্ছে, তার নাম ‘সুখা ধান’  অসময়ের সামান্য ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতেই এ ফসল ফলাবে।




চারদিকে নীল পাহাড়ের বেষ্টনি, মাঝে চাষের জমি, কিছু বাড়িঘরের আভাস, দূরে তুষারশৃঙ্গ, সব মিলিয়ে এই আমাদের অপূর্ব সারিগ্রাম বা সারিগাঁও।




এখানে ফুটে থাকে অসাধারণ কিছু জঙলি ফুল, যা ক্যালেন্ডুলা, জারবেরা বা কোরিয়পসিস নয়, অথচ তেলে-জলে, আদরে-আহ্লাদে রাখলে তাদেরও টেক্কা দিতে সমর্থ। এমরা সারিগাঁও থেকে বেরিয়ে যেখানে গেছিলাম, সেই হোটেল/রিসর্টের প্রধান দরজার দুপাশেই দুটি জঙলি ফুলের গাছ কোথা থেকে সংগ্রহ করে এনে লাগানো হয়েছে বাহারি টবে। না, তারা নীচের এ ফুলটির মতো হলুদ নয়, তবে চোখ ফেরানো যায়না এমন রূপ।




এখানে পাহাড়ের সুদূর উচ্চতায় পাক খায় পাহাড়ি শকুন



আর অনেক নীচে এক ছোট্ট স্কুলে শোনা যায় শিশুদের কলরোল। আমার বন্ধু সুস্মিতা সরকার সারিগাঁও ঘুরে এসে লিখেছে এই স্কুলটির কথা। অনেক ওপর থেকে শোনা যায় শিশুদের কোলাহল। কী যে ভাল লাগে। কিন্তু যা চোখে দেখেছি, তা দেখাতে অসমর্থ আমি। আমার কাছে নরমাল লেন্স ওয়ালা ক্যামেরা নেই। আমার জুম লেন্স যতটা পারা যায় কমিয়েও দৃশ্যটা অনেক কাছে চলে এল। রাস্তা থেকে খালি চোখে যতটা নীচে এই বিদ্যালয় দেখা যায়, আর তার সঙ্গে কলরোল শোনা যায়, তা এত ভাল লাগে, যে ভাষার প্রকাশ সম্ভব নয়। একই কথা সুস্মিতারও মনে হয়েছিল বলেই লিখেছিল।



পরের পর্বে থাকবে আরও কিছুটা সারিগ্রাম।


(চলবে)





25 comments:

  1. সুন্দর।দেখি,শুনি।অনুভব করি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. সত্যিই সুন্দর এই সারিগ্রাম বা সারগাঁও।

      Delete
  2. ৬৫ সালের কালিম্পঙের অভিজ্ঞতা পড়ে বেশ খারাপই লাগক :-(

    ReplyDelete
    Replies
    1. সে সময়ে কেউ ওই জায়গা দেখে থাকলে এখন কল্পনাও করতে পারবেন না, জায়গাটা কী রকম ছিল।

      Delete
  3. জুমচাষের খেতের ছবিটা অসাধারণ লাগল। পাখিটা মনে হল নিল্টাভা। সারিগ্রাম খুব শান্ত জায়গা, এখনো সেভাবে উন্নয়নের ধ্বজাধারীরা পৌঁছোয় নি মনে হয়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ, স্মল নিলটাভা-ই। উন্নয়নের লোকজন অচিরেই পৌঁছে যাবে। শীতের শেষে একবার যেতে পারলে হতো।

      Delete
    2. দাদা, আমি আবার যেতে চাই। যদি প্রোগ্রাম করেন আমায় ভুলবেন না।

      Delete
  4. খুব ভাল লাগলো। কিন্তু মনে হল, ছবিগুলি কিছুটা ক্ল্যারিটি হারিয়েছে, ওয়ার্ড ফাইলে আপলোডের জন্য।

    ReplyDelete
    Replies
    1. তা হতে পারে। আবার ছবিগুলোই খারাপ ছিল, তাও হতে পারে। আমি ক্রপ ছাড়া খুব বেশি পিপি করিনা। রীচ কম, ৪০০ তো।

      Delete
  5. সুন্দর লেখা আর ছবি।বুনোফুলের ছবি গুলো দেখে ওই খানেই চলে গেছিলাম।স্কুলের বাচ্ছা গুলোর কলরব,সকালের প্রেয়ার, উঁচু থেকে এতো ভালো লাগছিল যে আসতেই মন হচ্ছিল না।ছবিও নিয়েছি।কিন্তু ওই টেলিজুম।মিনিমাম 200😊। ডিসেম্বর এ আর একবার যাবার ইচ্ছা আছে।সারিগাঁও সত্যিই ছবির মতো সুন্দর।প্রথম পাখিটা নীলতাভা মনে হলো। খুব ভালো লাগছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. শীতের শেষে আবার যেতে মন চায়।

      Delete
  6. আপাতত আপনার চোখ দিয়েই সারিগ্রাম দেখি। কী যে সুন্দর সব ছবিগুলো!

    ReplyDelete
  7. উন্নয়নের নিষ্ঠুর পদচিহ্ন যে এখনও গাঢ়োওয়ালের এ
    ই প্রত্যন্ত সারিগ্ৰামে পরেনি, সে যে এখনও প্রকৃতির সমস্ত রূপ, রস, গন্ধ, বনফুল, আর রঙবেরঙের পাখীদের বুকে নিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী দের আনন্দ দিতে পারছে, সেটা জেনে ভীষণ ভালো লাগলো। এবারের এপিসোড থেকে কত বনফুল আর নাম না জানা সুন্দর সুন্দর পাখী দেখা হল। অনবদ্য অনুভবের দলিল হয়ে থাকবে এই লেখা।

    ReplyDelete
  8. ধন্যবাদ দাদা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. গাঢ়োওয়ালের এই এপিসোডগুলোতে আমি প্রায় নিমজ্জিত। দারুণ লেখার সঙ্গে অতুলনীয় ছবি এর সম্পদ।

      Delete
  9. ধন্যবাদ দাদা লেখা আর ছবি দিয়ে সারিগ্রাম দেখানোর জন্য।

    ReplyDelete
  10. এই পর্বটা সবথেকে ভাল। পাখি, মানুষ, ফুল, প্রকৃতি সব মিলেমিশে একাকার।

    ReplyDelete
  11. যাওয়া হয়ত হবে না। বা যতদিন পরে যাওয়া হবে ততদিনে পলিউটেড হয়ে যাবে এই সৌন্দর্য। আপনার ক্যামেরাতে দেখি ততক্ষণ!

    ReplyDelete
    Replies
    1. চেষ্টা তো করছি যতটা পারা যায়।

      Delete
  12. ব্লগে এসে আপনার লেখার স্টাইল ও পাল্টেছে দাদা। সব মিলিয়ে এ এক বিশাল পার্স্পেক্টিভ। স্থানমাহাত্য তো আছেই। অসাধারণ।

    ReplyDelete
  13. যাক, শুনে আশ্বস্ত হলাম।

    ReplyDelete

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...