সারিগ্রামের স্বরগ্রাম
আবার ফিরে যাই সেই দ্বিতীয়বার সারিগাঁওয়ের রিসর্ট থেকে বেরোবার গল্পে। আগেই বললাম,
এক কাপ চায়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু বীরভদ্র সিং নেগির কোনও পাত্তা নেই, তার স্ত্রীরও
না। সবই তালাবন্ধ, এমনকি তার দোকানও। তখন ভাবলাম আবার সেই লাফিং থ্রাশের ডেরায়
একবার গিয়ে দেখি। আগেরবার যখন গেছিলাম, বাইরে সকালের আলো ফুটলেও ওই জায়গাটা একটা
খাদের ধারে, তার ওপর বাঁকের মুখে। ওপাশে আবার খাড়া পাহাড়। তাই রীতিমতো অন্ধকার
ছিল। এখন একটু আলো হয়ত ফুটেছে। চেস্টনাট ক্রাউনড লাফিং থ্রাশের যা ছবি আমার আছে,
সবকটাই বেশ কম লাইটে তোলা। এবার যদি একটা ভাল স্ন্যাপ পাই।
আমি গিয়ে ওর বাসার পাশে ঘুরঘুর করছি, উঁকিঝুঁকিও মারছি ঝোপের গভীরে। যদি
বাবুর দর্শন পাওয়া যায়। হঠাৎ ঝোপের নীচের অন্ধকার থেকে উঠে এল এক পাখি, যাকে আগে
উড়ন্ত অবস্থায় দেখিয়েছি, কিন্তু নাম বলিনি। কেউ কেউ, যাঁরা চেনেন সে পাখিকে,
নিজেরাই আইডেন্টিফাই করেছেন দেখলাম কমেন্টে। এই পাখিকে নিয়ে আমার দুঃখের শেষ
ছিলনা। আমি আগে একবার বলেছি, আমার ক্যানন ক্যামেরা গভীর নীল রঙ ফোকাসে অসমর্থ।
লোকে শুনলে হাসবে। এই কোম্পানির নিজেদের সারভিস সেন্টারে গিয়ে বহু হাজার টাকার
বিনিময়ে সারভিস করিয়েছি। তাঁরাও হয়ত হেসেছেন, কিন্তু মুখে বলেছেন, এমন কি কখনও হয়?
নিশ্চয় আপনারই কোনও ভুল হয়েছে।
ব্যাপার হচ্ছে আমি সিরিয়াস ফোটোগ্রাফি, মানে এসএলআর ক্যামেরায় ছবি তুলছি ১৯৮০
সাল থেকে। এখন যাঁরা আমাকে জ্ঞান দিচ্ছেন, অনেকে জন্মাননি তখন। তাই এসব কথা শুনলে
রাগ হবার কথা, হয়ও। এই তো কিছুদিন আগে। লাটপাঞ্চারে গেছি। আগেই বলেছি ভার্ডিটার
ফ্লাইক্যাচার খুব, খুব সহজলভ্য পাখি হলেও সকলেই ছবি তোলে, তাকে পেলেই। হয়ত তার
কাছে কয়েক শো ছবি আছে, তাও তোলে। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে, মোটামুটি পনের বিশ ফীট
দূরে একটা উঁচু খুঁটির মাথায় ভার্ডিটারবাবু মেজাজে বসে আছেন। বেশ আলো টালোও আছে
চারদিকে। বিপিন আর আমি পাশাপাশি, ওর হাই এন্ড নিকন, আমার আমপাড়া ক্যানন। বিপিন
গোটা চার ছয় শট নিল, আমি কমপক্ষে পঁচিশটা। দশ মিনিট ধরে খ্যাচ, খ্যাচ, খ্যাচ,
মেরেই যাচ্ছি, বার্স্ট মোডে নয়, সিঙ্গল সিঙ্গল। শেষে পাখি পোজ দিয়ে দিয়ে বিরক্ত
হয়ে উড়ে গেল। আমি মনিটরে দেখলাম একটাও ছবি হয়নি, একটাও না।
যাক ভার্ডিটার গেল, এই লাটপাঞ্চারেই, নার্সারিতে নেমেছি একবার। দীপঙ্কর স্পট
করল, একটা স্মল নিলটাভা একটা শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের ঝাড়ের ওপর বসে। সবাই নিচ্ছে
খচাখচ, আমিও নিলাম, বাড়ি এসে পিপি করতে গিয়ে দেখি, চেনা যাচ্ছে বটে, কিন্তু একে
ছবি বলেনা। সিকিমের হী গাঁওয়ে, দীপঙ্করের সঙ্গে গেছি। দশ হাত তফাতে সে বসে। আমি
ছসাতটা নিলাম, এবার বার্স্ট মোডে, নাঃ হলনা। চীৎকার করে গাইতে ইচ্ছে করে, ‘ইয়ে নীল
রঙ, কব মুঝে ছোড়েগা -’।
আজ নীচ থেকে কে উঠে এল? সেই ‘স্মল নীলটাভা’। কাছে, বড্ড কাছে। আমি ক্যামেরা
তুললাম। জানি হবেনা। কিন্তু মন বলল, এত কাছে তো, এবার হয়ে যাবে, দেখ, ঠিক হবে।
হ্যাঁ, মাশাআল্লা, হয়ে গেল। শুধু হয়ে গেল না দ্দারুণ হল, দ্দারুণ। এত কাছে বলেই
বোধহয়। এই নিন, স্মল নিলটাভা। মজার কথা হচ্ছে, নিলটাভা মানে নীলচে আভা হলেও নামটা
ইংরিজি। আর ইংরিজিতে নীল হচ্ছে ব্লু।
ইত্যবসরে, ‘চেস্টনাট ক্রাউনড লাফিং থ্রাশ’ বাবুও বেরিয়েছেন। সে ছবি আর
দেখাচ্ছিনা, কারণ এর পরে যেখানে গিয়ে উঠলাম, সেখানে ঘরের পেছনেই এত ভাল ছবি
পেয়েছি, যে ইনি এখন থাকুন ঝোপের গভীরেই।
পথে যেতে আর এক লাফিং থ্রাশ পাওয়া গেল, ‘স্ট্রীকড লাফিং থ্রাশ’। এ বেচারির ছবি
কেউ তোলেনা, কী দুঃখ। অবশ্য ফোটোগ্রাফারের দোষ না। এই পাখি যদিও কাক শালিখের মত আধা
গৃহপালিত পাখি নয়, তবু এরা ভয়ডর বিহীন। মানুষের খুব কাছে মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে
ঘুরে বেড়ায়। তা এর ছবি কেউ তোলেনা কেন? তার কারণ একে তো খুবই সহজলভ্য। তার ওপর এ
ব্যাটাচ্ছেলে কেবল অন্ধকার ছায়াচ্ছন্ন জায়গায় টুকুস টুকুস করে লাফিয়ে বেড়াবে।
কিছুতেই আলোয় আসবেনা। আমাদের গত কুমায়ুন ট্যুরে সোমনাথ বলল, দাদা যদি একে কোনওদিন
রোদ্দুরে পেয়ে যান, দেখবেন রঙের কী বাহার। ব্যাটা সারাক্ষণ ছায়ায় ছায়ায় ঘোরে বলে
বোঝা যায়না।
তা আজ এক ব্যাটাকে পেলাম। রোদ্দুরে না হলেও আলোয়। পাওয়া মাত্র নিয়ে নিয়েছি। ভাল
করে দেখলে বোঝা যায়, মোটেই কুদর্শন নয় পাখিটা। শুধু অন্ধকারে থাকে বলেই আমল পায়না
ছবি তুলিয়েদের কাছে।
খানিক এগোতেই পাওয়া গেল। ‘পিঙ্ক ব্রাওড রোজফিঞ্চ’ পুরুষটিকে। এর ছবি আগেও
দেখিয়েছি। কিন্তু এত কাছ থেকে, এত ভাল ছবি বোধহয় আর হয়না। এরা রিসর্টের খুব কাছেই
শস্যক্ষেতের মাঝে একটা কাঁটা গাছে এসে বসেছিল। অকুতোভয়, আমি যখন ছবি নিচ্ছি, ভয়
পাওয়া বা উড়ে যাওয়ার কোনও লক্ষণই ছিলনা। বার কতক ঘাড় ঘুরিয়ে ‘হ্যালো’ বলেও দিল
আমাকে।
পুরুষ থাকলে নারীই না বাদ থাকে কেন, তাদেরও পেয়ে গেলাম, ওই কাছেই, সমদূরত্বে।
এক বেচারা কমন রোজফিঞ্চ পুরুষও বসে ছিল গা ঢাকা দিয়ে, একটু আড়ালে। এই সব
নামকরা বিশেষজ্ঞদের সামনে এ আর সামনে আসে? লজ্জাই পাচ্ছিল মনে হয়।
আর একটু এগিয়ে যাকে পাওয়া গেল, তিনি আমাদের গেরস্ত চড়াইবাবু নন, এঁর নাম 'রাসেট স্প্যারো'। একটু খেয়াল
করলেই বুঝবেন গায়ের রঙে কত তফাত। ইনি পুরুষ।
খানিক তফাতে এঁর গিন্নিকেও পাওয়া গেল। তিনি আমাদের ঘরোয়া চড়াই গিন্নির চেয়ে
রঙে রূপে আলাদা।
সারি গাঁও তে আমরা বার তিনেক এসেছি। এমনিতে আসার কথা ছিলনা। কিন্তু সেই যে
‘রেড ফ্রন্টেড সেরিন’ আমি আবিষ্কার করলাম, তাকে ক্যামেরাবন্দি করতেই আমাদের দলের
অন্যরা দফায় দফায় এসেছে। আমিও এসেছি তাদের সঙ্গে। কেবলমাত্র সেরিন ছাড়া আর যে সব
পাখি পরেও পেয়েছি তাদেরও এখানেই দিয়ে দিচ্ছি। কেবল সেরিনের গল্পে আসব আর একবার।
আমার অনেক দিনের টার্গেট ছিল ‘ব্ল্যাক চিনড ব্যাবলার’। আগে পাইনি তা নয়,
কিন্তু খুব কাছে, নানা কৌণিক অবস্থানে এমনটি আর পাইনি। খুব ভুতুড়ে পাখি, সামনে
থেকে দেখলে। একদম মুখোমুখি ছবিও পেয়েছি, কিন্তু ভাল ফোকাসে ছিলনা। তাই এটা।
এর পরেরটায় ক্লোজ আপ, রডোডেনড্রনের মধু খেয়ে তখনও ঠোঁটে লেগে আছে।
সেই যে অ্যাংরি বার্ড দেখিয়েছিলাম, তার নাম আগেও বলেছি, ব্ল্যাক থ্রোটেড টিট।
আসলে মুখের আর গলার পালকের রঙ এমনই, খুব রাগি রাগি দেখতে লাগে সামনে থেকে। আসলে
খুবই সুন্দর পাখি।
সব শেষে আর এক এমন পাখি, যার ছবিও ফোটোগ্রাফাররা তোলেন না। কারণ পাহাড়ে এ আর
এক সহজলভ্য পাখি। কত তুলবেন! তবে এ ছবিতে দৃশ্যপট, বিন্যাস ও ফ্রেমিং এমনই, যে
নিতেই হলো। এর নাম নিশ্চয় জানেন, ‘রুফাস সিবিয়া’।











ফাটাফাটি ছবি দিয়েছেন। উপরে না উঠে আপনার সাথে সেদিন থেকে গেলেই হতো দেখছি😊
ReplyDeleteকী যে বলো। তোমরা কি কম ফাটাফাটি তুলেছ? আমি রাম তো তুমি শ্যাম।
Deleteওয়াও!অ-সা-ধা-র-ণ। আমার চোখের দোষ কিনা জানিনা, কিন্তু আজকের মত সুন্দর সুন্দরী পাখি শেষ কবে দেখেছি মনে নেই।
ReplyDeleteব্লগের ছবিগুলো যেন বেশী সুন্দর।
আমি ধন্য হলাম।
Deleteপ্রত্যেকটা ছবিই সুন্দর।
ReplyDeleteথ্যাঙ্কিউ
DeleteNice pics and description of the place
ReplyDeleteThanks a lot.
ReplyDeleterufous sibia naki rongtulite anka chhobi !... apurbo....rusted sparrow male aar female amar o koekta achhe....rajar ghore je dhon achhe tunir ghoreo se dhon achhe...ajker porbo The Best.... aro ghurun rupankarbabu.....aajker din tai osamanyo hoe galo ...
ReplyDeleterusted নয়, ওর নাম 'russet' sparrow.
ReplyDeleteঅপরূপা সারিগ্ৰাম আর তার বিচিত্র প্রাকৃতিক সম্ভার! দেখে দেখে আশ মেটেনা এত বিপুল ঐশ্বর্য - যা অসম্ভব পরিশ্রমের ফসল। এত সুন্দর অ্যালবাম, তার সঙ্গে এমন প্রাঞ্জল লেখা, তুলনা হয়না। 'নোটের' চেয়েও বহুগুণ ভাল ছবি পাচ্ছি 'ব্লগে'। ফটোগুলোর রেজোলিউশন অনেক পরিচ্ছন্ন। আপনার পরিশ্রম সার্থক।
ReplyDeleteদাদা, অনেক ধন্যবাদ।
ReplyDeleteআহা কত কত পাখি! আর ব্ল্যাক চিনড ব্যাবলারের ঠোঁটে মধু...অসাধারণ।
ReplyDeleteধন্যবাদ।
Deleteভাগ্যে ফেবু নোট ডিসেবল করল। এমন ক্লারিটির ছবি থোড়াই দেখতে পেতাম। ঢের ভালো দেখছি। এঁটো মুখ পাখির এমন ছবি কক্ষনো দেখিনি। ছবিগুলো দেখানোর জন্য অনেক থ্যাঙ্কু জেঠু।
ReplyDelete
Delete😊
কদিন পড়া হয়নি। আজ পড়ছি। অসাধারণ ছবি হয়েছে দাদা ❤❤❤ উফ্ যেতেই হবে আবার ����
ReplyDelete