দা বার্ড ট্র্যাভেলার্স
এই যে বারোখানা এপিসোড বা পর্ব লিখে ফেললাম ‘পোথি-পথিকরা’ বলে, ব্লগের নামও
‘পোথি পথিক’। তা এই শব্দটির অর্থ কী? ‘পোথি’? এতদিন অর্থহীন মনে হচ্ছিল
অনুপ্রাসটি। এখন সময় হয়েছে বলার।
ওরা ফিরে এসেছে দেওরিয়াতাল থেকে। বিশেষ কিছু উল্লসিত হওয়ার মতো পায়নি। আবার
একেবারে খালি হাতেও ফেরেনি। এমনটাই হয়। একবার বিপিনের চাপে পড়ে লাটপাঞ্চার গেছিলাম
বর্ষাকালে। তখন তো পাখি পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। বিপিন, মেজদাদের ধারণা ছিল
পাহাড় মানেই পাখি। যাই হোক, কিছুই পাইনি, কিচ্ছুনা ওখানে। আমাদের রিসর্টের সামনে
কয়েকটা রাসেট স্প্যারো ঘুরছিল শুধু। তবে আমরা ভারতের বিরলতম প্রাণী এসিয়ান
স্যালাম্যান্ডার দেখে এলাম অহলদারা গিয়ে। অন্য সময়ে গেলে কিছুতেই হতোনা। কিন্তু সে
তো পাখি নয়। পাখির কথা বলতে মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে শীতে গেলে কত যে
পাখির মেলা কী বলব। বর্ষাকালে তো কিচ্ছু নেই, কাকও না। কিন্তু আমি পেয়ে গেলাম
একজোড়া ‘পেল ব্লু ফ্লাইক্যাচার’। যা ইহজীবনে অন্যত্র পাইনি।
তাই যারা কষ্ট করে দেওরিয়াতাল উঠল, তারাও পেয়েছে কিছু না কিছু তো বটেই। হয়ত
যেমনটি আশা করে গেছিল, তা হয়নি। যাই হোক আমার ‘সেরিন’ দর্শনে বাকিরা খুবই উল্লসিত।
তারাও গেল হৈ হৈ করে, কিন্তু ‘তোমার দেখা নাইরে, তোমার দেখা নাই’। এবার আমাদের
যেতে হবে এ জায়গা ছেড়ে। আমরা যাব সাত কিলোমিটার দূরে একটা জায়গায়, যার নাম
‘পোথিবাসা’। কী অর্থ এই নামের? পোথিবাসা মানে, ‘পাখির বাসা’। এই বাসা শব্দটি
বাংলা। কিন্তু বাংলা অনেক শব্দই গাঢ়ওয়ালে ব্যবহৃত হয় তা আগেই বলেছি। কিছু বঙ্গযোগ
ছিলও। সুন্দরলাল বহুগুণার কথাও লিখেছি আগে। যাই হোক, 'বাসা'-র মানে বাসা হলেও ‘পোথি’ মানে পাখি। আর
পোথি-পথিক শব্দবন্ধের আমার কাছে মানে হলো, ‘দা বার্ড ট্র্যাভেলার্স’। আমার ব্লগের হেডিং কিছুদিনের মধ্যেই
একটু রঙিন হবে। আর ইংরিজিতে নীচে থাকবে ও কথার অর্থ।
আলাপ হলো আমাদের গাইড, দীনেশ নেগির সঙ্গে। এই চোপতাতে খুব নামকরা গাইড হচ্ছেন
ইয়শওয়ন্ত(যশোবন্ত) নেগি। কিন্তু তেনার খুব পা মোটা হয়েছে আজকাল। তাঁকে নাকি
কনট্যাক্ট করা হয়েছিল, তিনি নাকি সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর কোনও
‘ডেট’ নেই। সুন্দরী কলগার্লরা এমন বলে থাকেন শুনেছি। যাই হোক, হোয়াটেভার। এদিকে এই
নেগি বাবুর একটা রিসর্ট ছিল, উঁচুতে কোথাও। আমার এ অঞ্চলের টোপোগ্রাফি খুব একটা
রপ্ত নয়। সত্যি কথা বলতে কি কোনও অঞ্চলেরই নয়। যে অঞ্চলে বহুবার গেছি, সেখানেও
আমার রাস্তা গুলোয়। তা সেই রিসর্ট নাকি পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে সেই যেবার কেদারে
সাংঘাতিক হড়পা বানে হাজার দশেক প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেই ঘটনায়।
যে মানুষগুলো মারা গেলেন, এবং যে পরিবারে কিছু সারভাইভিং সদস্য বেঁচে রইলেন,
তাঁদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি নিয়েই বলছি, এমনটা দরকার ছিল। বারো বছরের নীচের মেয়েকে
রেপ করলে নাহয় ফাঁসি দিচ্ছ। প্রকৃতি, সে বারোই হোক বা বিরানব্বই, কেউ তো ছাড়ছনা।
যে গাছ কেটে বাড়ি বানাচ্ছ, সেও রেপিস্ট, আর যে পাহাড়ের ‘সৌন্দর্য’ উপভোগ করতে করতে
অমুক ভাজার টেট্রাপ্যাক পথের ধারে ফেলে আসছ, সেও। মরো, ডাই। ইউ শুড।
তা যাই হোক, সেই বড় নেগির রিসর্ট ধ্বংস হয়েছে। তাঁর নাকি সময়ও নেই, তাই এবার তেনার ভাইপো ছোট নেগি,
নাম দীনেশ। এমনি ছেলে ভালই, তবে তারা উচ্চ ঘর, কংসরাজের বংশধর। মালটি সেয়ানা অতি,
এবং ধান্ধাবাজ। তবু আমাদের কিছু কিছু সদস্যের দেখলাম তার প্রতি গভীর প্রেম। তা
থাক, মেরা কেয়া। এর কথা পরে বলছি, এখন চলুন পোথিবাসা যেতে যেতে এই ছোটনেগি কীভাবে
‘পোথিকৃত’ হলো, তাই দেখা যাক।
আমাদের যাত্রাপথের প্রথম পাখি, ঠিক প্রথম নয়, দ্বিতীয়, কারণ প্রথমটিকে একটু
আগেই দেখিয়েছি, হলো ‘গ্রে হূডেড ওয়ার্বলার’। আমার লেখা যাঁরা আগেই পড়তেন, তাঁরা
জানেন, আমি বলি, এমনিতে ওয়ার্বলার আইডেন্টিফাই করা খুবই দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু এই
পাখিটি খুব সহজেই আইডেন্টিফায়েবল। আবার অন্য কথা হচ্ছে, আগে বলেছি ভার্ডিটার
কয়েকশো থাকলেও কেউ ছাড়েনা। এও তাই। সামনে পেলে লোকে ছবি তুলবেই। তার প্রধান কারণ
হচ্ছে খালি চোখে এর হলুদ রঙের পেট দেখে চট করে বোঝা যায়না এ গ্রে হূডেড নাকি ইয়েলো
বেলিড। তাই আগে মেরে দাও, পরে এনলার্জ করে দেখ। তা এবার দেখা গেল ইনি বাড়ি তৈরির
সরঞ্জাম যোগাড় করছেন। মানে সুখবর। যদি না খারাপ কিছু ঘটে, আমরা আরও কয়েকটি গ্রে
হূডেড পেতে চলেছি। আমরা মানে, পৃথিবীবাসী।
এর পরের ছবিতে আছেন ‘অ্যাশি ড্রঙ্গো’। ফিঙে পাখিকে ইংরিজিতে বলে ‘ড্রঙ্গো’ আর
হিন্দীতে ‘কোতওয়াল’। তবে এই হিন্দী নামটা এখন বাতিলের জায়গায় এসে গেছে। কেন, তা
অন্য প্রসঙ্গ, অন্য জায়গায় আলোচ্য। সাধারণত আমরা যে ফিঙেকে গ্রামাঞ্চলে তারের ওপর
বসে থাকতে দেখি এবং যার ডাক থেকে এই ‘ফিঙে’ নামের উৎপত্তি, তারা ছাড়াও অনেক রকমের
ফিঙে আছে এবং তাদের বেশির ভাগকে আমাদের বঙ্গভূমেই পাওয়া যায়, বাকি ভারতে না হলেও।
এই ফিঙের নাম ‘অ্যাশি ডঙ্গো’, যদিও খালি চোখে রঙের তফাত সাধারণ মানুষ নাও ধরতে
পারেন।
আর খানিক এগিয়ে যাকে পাওয়া গেল, সেও কুমায়ুন গাঢ়ওয়াল অঞ্চলে খুবই সহজলভ্য
পাখি। আসলে গোটা হমালয় জুড়েই তার বাস আর উত্তর পূর্বের কিছুটা। এর নাম ‘ফায়ার
ব্রেস্টেড ফ্লাওয়ারপেকার’। আমাদের বাংলায় সানবার্ডকে বলা হয় ‘মৌটুসি’ আর এর নাম ‘মৌচুষি’।
তবে মৌচুষি অনেক রকম হয়। এই ফায়ার ব্রেস্টেড, মানে আগুন-বুকো, বাংলার পাখি নয়।
এর পরে যাকে পাওয়া গেল, সে পাখিটি খুবই সুন্দর, তবে ছবিটি সুন্দর হলোনা। সামনে
একটা ডাল চলে এল। আগে নামটি বলি, এর নাম ‘ব্ল্যাক লোরড টিট’। খুব কাছাকাছি দেখতে
আরও দুটি ‘টিট’ গোত্রের পাখি আছে। যাই হোক ছবিটা খুব কাছে পেয়েছিলাম। ডালটা
সব্বোনাশ করল। আচ্ছা দেখে নিন, বলছি –
এই ডালটা সরানো যেত। এই দেখুন এখানে ডাল ছিল সামনে, আমি পেছনে নিয়ে গেছি। আগেরটাও
যদি তাই করতাম, ছবিটা কী সুন্দর দাঁড়িয়ে যেত। তবে আমি অন প্রিন্সিপল এমন কাজ পরিনা
পারতপক্ষে। এই অন্যায় আমি তখনই করি, যখন খুবই দুর্লভ পাখি পেয়েছি, যাকে ইহজীবনে আর
নাও পেতে পারি, এমন সিটুয়েশন হয়।
এবার আমরা পোথিবাসা-তে আমাদের হোটেল বা রিসর্টে মালপত্র জমা করে বেরিয়ে পড়লাম
আরও টারগেটেড কিছু পাখির খোজে। সকলেরই মূল চাহিদা ‘মোনাল’ পাখির, আসল নাম ‘হিমালয়ান
মোনাল’। আমাদের সাহেব প্রভুদের হাতে পড়ে পাখিদের নাম প্রায়শই বদল হয়। তখন পুরনো
নাম লিখলে আবার সাহেব চাটা কিছু ‘পক্ষীবিদ’ সাত তাড়াতাড়ি নতুন নাম বলে বিদ্যে
জাহির করেন। আমি কিন্তু ডেলিবারেটলি, বা ইচ্ছাকৃত ভাবেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরনো
নামই লিখি। এ পাখির আগে নাম ছিল ‘মোনাল ফেজ্যান্ট’। এবং খুব সহজ যুক্তিতে এটাই ঠিক
নাম ছিল। বেসিকালি এটা ফেজ্যান্ট পাখিই।
যাই হোক আমার তেমন একটা মারাত্মক উৎসাহ ছিলনা, কারণ আমার কাছে মোনালের বেশ
কিছু ছবি আছে। তবে পাখিটা দেখতে সুন্দর, কাচপোকার মতো উজ্জ্বল ফ্লুওরোসেন্ট রঙ।
পেলে তো তুলবই।
একটা ঝর্ণা পেয়েছিলাম পথে। অম্লান বলল শাটার স্পীড খুব ধীর করে তুলতে, তাতে ওই
কাসকেডিং এফেক্টটা খুব ভাল করে বোঝা যায়। আমি তুললামও। কিন্তু অনেকগুলো ধারাকে
তুলতে পারলে তবে সেটা হতো। আমার যেহেতু জুম লেন্স ছাড়া কিছু নেই সঙ্গে, তাই দূর
থেকে ছবি নিয়ে তাতে বহুধারা তোলা গেলনা।
(চলবে)






সুন্দর। পরবর্তী কিস্তির অপেক্ষায়। পাখি সত্যিই খুব সুন্দর জীব।
ReplyDeleteধন্যবাদ। আসছে, পরের কিস্তি।
Deleteআচ্ছা পাঁচতারা হোটেলে যেমন কিছু নির্দিষ্ট শর্ত থাকে হোম স্টে কে রিসর্ট বলার সেই রকম কিছু নীতি আছে কি ?
ReplyDeleteহোম স্টে যে কনসেপ্টে শুরু করা হয়েছিল, একমাত্র লাটপাঞ্চারের পদম গুরুঙের বাড়িটা ছাড়া আর তেমন বিশেষ দেখিনি। বেশির ভাগই রিসর্ট। আসলে বাড়ির লোক আর অতিথি পাশাপাশি থাকবেন, বাড়িতে যা রান্না হয় তাই খাবেন, কিন্তু আতিথেয়তা বাবদ কিছু অর্থ দিয়ে আসবেন, এটাই তপ হোম স্টে-র কনসেপ্ট ছিল। পরে বেশিরভাগই ক্ষুদ্র হোটেলে দাঁড়িয়ে গেছে, রিসর্টও নয় সবগুলো।
Deleteহোম স্টে না বলতে হলে হোটেল বলা যেতেই পারে। কিন্তু রিসর্ট বোধহয় একটু অন্য জাতের বলে আমার ধারণা ছিল।
Deleteচলুক,আমরাও অপেক্ষায় থাকি।
ReplyDeleteধন্যবাদ।
Deleteচলুক,আমরাও অপেক্ষায় থাকি।
ReplyDeleteচলেছি সাথে দাদা।
ReplyDeleteচলো, এগোচ্ছি।
Deleteযসবন্ত নয় ওর নাম যসপাল নেগী।
ReplyDeleteআচ্ছা, পরে এডিট করে দিচ্ছি।
ReplyDelete'প্রকৃতি সে বারো হোক কিংবা বিরানব্বই হোক, কেউ তো ছাড়ছোনা'- অসাধারণ একটি উক্তি। মানুষের দেওয়া শাস্তির চেয়ে প্রকৃতির নিজের হাতে দেওয়া শাস্তি অপ্রতিরোধ্য ও নির্মম। আমার মনে হয় প্রকৃতি এভাবেই তার হিসেব বুঝে নেয়। অনন্য কতকগুলো পাখীর ছবিও দেখা হল।
ReplyDeleteপোথি পথিক মানে বুঝলাম। দারুণ নামকরণ...তেমনি সব ছবি। সঙ্গে চলছি...
ReplyDeleteঠিক তাই দাদা। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধ মানুষ চেনেনা। পাপ করে কেউ আর শাস্তি পায় অন্য কেউ।
ReplyDeletebah, pothi pothik bhari sundor naam holo to .....cascaded faling spring e sirir moton dhap thakle khun bhalo hoto.tarpor gorie asa jol low angle e silk hoe jae.....amar ekta achhe....jhorna noe artificial fountain er... shot ta amar praner dhon bolte para jae .... aro pahare gele tulben, kemon...pahari jhorna to dekhini kokhono
ReplyDeleteআচ্ছা, এবার পেলে তাই করে আনব।
Deleteমানানসই লোকজন পাওয়া সম্ভব নয় আর দাদা।
ReplyDeleteযা পাওয়া গেল, এই ঢের! "
😊
Delete