Sunday, 22 April 2018

পোথি পথিকরা - ৮


পোথি পথিকরা


 আরও এগিয়ে চলি পাহাড়ি রাস্তা ধরে আছে কিছু বাড়িঘর, ক্ষেতখামার, সবই প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে মানুষ তো থাকবেই, মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ এই পাহাড়, জঙ্গল, গ্রাম, ক্ষেতখামার, ওদিকে তুষারাবৃত হিমালয়, সব মিলে যে এক অপূর্ব দৃশ্য, তা অনেকদিন দেখিনি কোনও পাহাড়ে গিয়ে এখানে এসে চোখ জুড়িয়ে গেল


কিন্তু মানুষ যখন প্রকৃতিকে গ্রাস করে, তখনই অবস্থা হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর মনে আছে, বেশ কিছুকাল আগে, দার্জিলিং হিলস রিশপনামে শৈলাবাসে আমার এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেখানে অন্য প্রতিকূলতা ছিল মানুষ প্রকৃতি পাশাপাশিই ছিল, কিন্তু অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাবে সেখানকার মানুষ গুলতি দিয়ে পাখি মেরে ফেলত না, খাবার জন্য নয়, এমনি, জাস্ট ফর ফান

বেশ কবছর পরে রিশপ গিয়ে আমি আঁতকে উঠেছিলাম সেই সব ঝোপ গুল্ম একদম সাফ দুই তিন হোটেল হয়েছে সেখানে মানুষ দলে দলে যাচ্ছেনকাঞ্চনজঙ্ঘাদেখতে টাইগার হিল থেকে বা দার্জিলিং এর মল থেকে (ইচ্ছে করেই ম্যাল না লিখে মল লিখলাম কারণ ব্যক্ত করছিনা) দেখে আর মন ভরছেনা কী সর্বনাশ যে হয়ে গেল, কাকে বোঝাবে, কেই বা বোঝাবে ওখানে অত বেশি হোটেল হওয়ার জন্য অকুপ্যান্সি রেট ভীষণ কম আরও নাকি হবে আস্তে আস্তে বার্ড ট্যুরিজম থেকে রিশপ হারিয়ে যাবে হোটেলগুলোও মাছি মারবে একদিন এখনই তেমন নেহাত পুজো টুজোর সময় ছাড়া গেলেই জায়গা মেলে

সারিগাঁও তেমন হবেনা বলেই প্রত্যয় তার কারণ, একমাত্র দেওরিয়াতালে ওঠা ছাড়া গ্রামের আর আকর্ষণ নেই পাতি ট্যুরিস্টদের কাছে আমার আগের পর্বগুলোর মন্তব্যে মেসেঞ্জারে অনেক মানুষের কথা পাচ্ছি যাঁরা সারিগাঁও বা সারিগ্রামে গেছেন আগে যে বাড়িটি দেখালাম, শ্রী অরুণ কুমার মল্লিক তেমন বাড়ি কী করে বানানো হয়, তার খোজ খবর নিয়েছেন স্থানীয়দের কাছ থেকে ৭ম পর্বের মন্তব্যে আছে সে কথা উনি লিখছেন, তেমন বাড়ি নাকি বেশ কিছু ছিল আগে, ধীরে ধীরে কঙ্ক্রিটের আবাস এদের সরিয়ে দখল নিচ্ছে এলাকার তাই হয়, তাই হয়েছে গোটা পাহাড় জুড়েই কিন্তু গাঢ়ওয়ালে এখনও দেখছি দুচারটে কুমায়ুনের ঝালতোলাতে জঙ্গলের মধ্যে একটি এমনই পোড়ো বাড়ির কবাটহীন জানলার মাঝখান থেকে হিমালয়ের তুষারশৃঙ্গের ছবি আমি পোস্ট করেছিলাম সে বাড়িটি পরিত্যক্ত, কোনও এক সময়ে রাজার পাহা্রাদারের বাসগৃহ ছিল তবে ওদিকে পাথর সাজানোর কায়দা অনেক মোটা দাগের গাঢ়ওয়ালের এমন একটি দারুণ নিদর্শন দেখাব একেবারে শেষের দিকে

আমি এগোচ্ছিলাম জঙ্গলের দিকে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ভারি গলায় কুকুরের ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম এখানকার সাধারণ কুকুরও একটু অন্যরকম পাহাড়ি কুকুর মাত্রেই লোমশ, একটি ভারি চেহারার হয় কুমায়ুনেও এমন কুকুরই দেখা যায় তবে গাঢ়ওয়ালের অঞ্চলে কুকুরগুলো অধিকাংশই কুচকুচে কালো কিছু কুকুরের চোখ মুখের পাশে হলুদের ছোঁয়া অন্য রঙের কুকুর নেই বললেই চলে কেবল আমরা যে হোটেলে উঠেছি, তাদের পোষা একটি আছে ধবধবে সাদা রঙের তবে সেটি আকারে অনেক ছোট এবং অন্য কোথাও থেকে আনা হয়েছে বলেই প্রত্যয়

নীচে দুটি কুকুরের ছবি দিলাম এই দু ধরণের কুকুরই গাঢ়ওয়ালের অঞ্চলে দেখা যায় এরা এমনিতে শান্ত স্বভাবের, খালি ডাকাডাকি করে অচেনা লোক দেখলে তবে হাটে বাজারে হোটেলের সামনে, যত কুকুর দেখেছি, তারা গা ঘেঁষে ঘোরাঘুরি করে, মাথায় হাত বোলালে খুশি হয় ডান দিকের এই কালো কুকুরটিকে আমি এই সা্রিগাঁওতেই একটা চায়ের দকানের সামনে পেলাম এক প্যাকেট বিস্কিট কিনে খাওয়াতে লাগলাম অম্লান গাড়ির জানলা দিয়ে বলল, ‘হাতে ধরে খাওয়াবেন না, কখন দাঁতে লেগে যাবে, ভীষণ ক্ষুধার্ত তাই কয়েকটা খাইয়ে পরেরগুলো দোকানের সিঁড়িতে রাখলাম

কিন্তু আমার যাওয়ার পথে, পথটি দেখাচ্ছি নীচে,

  
হঠাৎ যমদূতের মতো এক কুকুর নেমে এল ওপরের কোনও লোকালয় থেকে সেটি ওপরের ছবির বাঁদিকের গোত্রের, তবে ছবির কুকুরটি নয় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড গর্জন করতে লাগল আমি প্রায় বিশ ফীট দূরে দাঁড়িয়ে গেলাম কুকুরের ফাঁকা আওয়াজ আর গর্জন আমি খুব ভাল চিনি এখন কী করি? ফিরে যাব?

 সহসা দেবদূতের মতো এক লোকের আবির্ভাব লোকটি খেটে খাওয়া মানুষ, পাহাড়ি জামাকাপড়, মাথার টুপিও স্থানীয়দের মতই তাকে আমি বললাম, ভাই এই কুকুরটাকে একটু তাড়িয়ে দেবে? তাহলে আমি ওদিকে যেতে পারি আমি পাখিদের ছবি তুলতে এসেছি লোকটি একটা লাঠি যোগাড় করে তাড়া করে কুকুরটিকে ভাগাল বটে, তবে সে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িতে আমাকে মাপতে লাগল লোকটি বলল, আমি স্থানীয় ঠিক নই, আমরা নেপাল থেকে আসি, বছরে কয়েক মাস করে কাজ পাওয়া যায় এখানে নানা ধরণের কাজ দৈনিক চার পাঁচশ টাকা আয় হয় চার মাস পরে আমরা ফিরে যাব দেশে অন্য লোকরা আসবে পেছনে কয়েকজন মহিলা আসছিলেন খুব ঠাওর করে দেখলে স্থানীয়দের সঙ্গে এঁদের তফাত ধরা যায়, যদিও এঁরা টিপিকাল মঙ্গোলিয় মুখাবয়বের নন আসলে নেপালের সর্বত্র এক ধরণের মানুষ থাকেন না মহিলাদের ফোন বেজে উঠতে, তাতেও রিঙ টোনে নেপালি গান বাজছিল শুনলাম

 আমি লোকটির পিছু পিছু জঙ্গলের দিকে গেলাম লোকালয়ের বাইরে, জঙ্গলের শুরুতে খানিক ফাঁকা জায়গা সেখানে দেখি এক ক্রিকেট পিচ জমি্টি সমতল নয়, ক্রিকেট খেলার উপযোগিও নয় কিন্তু টেলিভিশন আর মোবাইলের আমদানির সঙ্গে সঙ্গে সারা ভারতে সংক্রামক ব্যধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই খেলা(?) আমাদের কালে কলকাতার সামান্য বাইরে শহরঘেঁষা মফঃস্বলেও ক্রিকেট ব্যাপারটা কল্পনার অতীত ছিল অবশ্য সে ক্রিকেট আজকাল আর খেলেনা কেউ এখন যা খেলা হয়, তা বেসবলের কাছাকাছি একটা কিছু

  জঙ্গলের মধ্যে থেকে নানারকম পাখির ডাক আসছিল আমি খানিক ভেতরে যাওয়ার চেষ্টাও করলাম শুঁড়ি পথের দুধারে ডালপালা বিস্তার করা কাঁটাগাছ তাদের ডাল ভেঙে ভেঙে এগোতে হচ্ছিল একটা বেধে গেলেই বিপদ, অজস্র কাঁটায় জামাকাপড় ছিড়বে, হাতও ছড়ে যাবে কিন্তু বেশিদূর যাবার সাহস পাচ্ছিলাম না এক চোখে সেই নেপালি মানুষকে নজরে রেখেছিলাম সে কিছুর অন্বেষণে পাহাড়ের ওপরে উঠেছিল আমি জানতাম, ওর সঙ্গেই আমাকে ফিরতে হবে পথে শমন দাঁড়িয়ে আছে যে

 নেপালি নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ফিরতে লাগলাম থাক পড়ে পাখিবাজি বিদেশ বিভুঁইয়ে কুকুরের কামড় খেলে অ্যান্টি র‌্যাবিস ফুঁড়বে কে আমায় এখন! নেপালি বলল, আসলে এমনিতেই এরা বাইরের লোক বেশি দেখেনা আপনারা বাজারে বা হোটেলে যে সব কুকুর দেখেন, তারা বাইরের লোক দেখে অভ্যস্ত তার ওপর আপনার হাতে এই লম্বা ক্যামেরা দেখে অস্ত্র মনে করেছে এমন তো দেখেনা সচরাচর আমি বললাম ধন্যবাদ ভাই মাথায় থাক ছবি তোলা, তোমার সঙ্গে ফিরতে পারলেই বাঁচি

খানিক যেতেই নীচে খাদের দিক থেকে কিচিরমিচির কানে আসতেই আমি তাকিয়ে দেখি এক ঝাঁক পাখি এমন পাখি আমি আগে দেখিনি ক্যামেরার জুম লেন্সে চোখ লাগিয়ে এদের ফিঞ্চ গোত্রেরই মনে হলো বেশ কয়েকটা ছবি নিলাম কুকুরের ভয়েই হোক বা যে কারণে, হাত টাত কেঁপে গিয়ে একটাই হলো ঠিকঠাক একতা শুকিয়ে যাওয়া গাছে বীজ জাতীয় কিছু খেতে এরা ভিড় করেছিল তখন তো জানিনা যে আই হ্যাভ স্ট্রাক গোল্ড



(চলবে)

5 comments:

  1. যথারীতি অসাধারণ। পাখির ছবি কৌতুহল জাগিয়ে রাখল।

    ReplyDelete
  2. খুব ভালো লাগছে।কী পাখি, জানার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
  3. আমি বহুদিন থেকেই ভাবছি, এত ভোরে ঘোরাঘুরি করেন, কুকুর থাকেনা? না, মানে, কুকুরের কথা আগেও শুনেছি কিন্তু এইরকম ভয়ানক কুকুর!!

    ReplyDelete
  4. পাখিগুলো অপূর্ব!!

    ReplyDelete
  5. কী পাখি দেখি পরের পর্বে.

    ReplyDelete

পোথি পথিকরা (The bird travellers) - ১৯

কিছু ছবি তাড়াহুড়োয় দেখানো হয়নি, এখন দেখিয়ে নিই। এ পাখিটি পাহাড়ে খুবই সহজলভ্য। কিছু কিছু জায়গায়, যেমন কুমায়ুনের ‘ধওলছিনা’য় চড়াইয়ের...