পোথি পথিকরা – ২
এয়ারোডায়নামিক্স, দ্রৌপদী ও ভৌতিক কাহিনী
কী ভাবছেন? বুড়োটা পেগলে গেছে! ওপরের তিনটে শব্দের মধ্যে সম্পর্ক কী? ও! দাঁড়ান দাঁড়ান, এর সঙ্গে আর একটা যোগ হবে, ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’। এবার আর কোনও সন্দেহই নেই মাথার সুস্থতা নিয়ে। তাই যাঁরা এর পরেও এগোতে চান, তাঁরাই এগোন।
প্রথমে বাতাসের গতি নিয়ে কথা। আমরা বসে ছিলাম বড় ঘড়ির সামনে, আগেই বলেছি। ঘড়িতে সময়ও দেখা যাচ্ছে সম্ভবত। গা চিটচিটে গরম, একটুও হাওয়া নেই। কৌশিক মাইতি মশাই একটা নরম পাণীয় কিনে আনলেন, এক্কেরে চিলড। সেটা খেয়ে খানিক গা জুড়োল। কিন্তু তার দম আর কতক্ষণ! এদিকে ঐ ভাবে কুঁজো হয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে থাকতে পিঠে ব্যথা করছিল। উনি বললেন, চলুন মাঝখানে রেলের যে বসার জায়গা আছে, এত রাত হয়ে গেছে, নিশ্চয় কিছু খালি হবে। চলুন ওখানে।
উনি বলার সঙ্গে সঙ্গেই ওদিকে তাকালাম। খুব অবাকই হয়ে গেলাম। আগে ঐ বসার জায়গায় অনেক উঁচুতে বীম থেকে ঝোলানো সায়েবি আমলের ইন্ডিয়া ফ্যান বা ক্যালক্যাটা ফ্যান লাগানো থাকত। পরে সেগুলো রিপ্লেসড হয়, কারণ সহজেই অনুমেয়। ও ফ্যান লাখ টাকাতেও মিলবেনা এখন। ইন্ডিয়া ফিন্ডিয়া নয় আমার চার বছর বয়সে কেনা জিইসি ফ্যান এখনও চলছে বাড়িতে, বেয়ারিং টেয়ারিং না পাল্টেই। প্রায় ৬৬ বছর রানিং।
তা হঠাৎ দেখি বিশাল উঁচু সিলিং এর বীম থেকে লম্বা-আ রড দিয়ে ঝোলানো সেই সব সারি সারি ফ্যান হাওয়া। একটা মাত্র ফ্যান ঘুরছে তাও মাঝখানে নয়, একদিকের কোণায়। সে ফ্যানের ব্লেডের দৈর্ঘ বিশাল, প্রায় দশ বারো ফীট হবে। বেশিও হতে পারে। তবে তা ঘুরছে অতি আস্তে, ফ্যান কোথায় বনবন করে ঘুরবে, তবে না হাওয়া! আমি হে হে করে বললাম, দেখেছেন কাণ্ড, অত্তবড়ো এক ফ্যান, তার ব্লেড মাইলখানেক লম্বা কিন্তু ঘুরছে দুলকি চালে। এতে কী হাওয়া হবে?
প্রিয় পাঠক, আপনারা ‘ডন কিহোতে’ উপাখ্যানের চিত্রে উইন্ড মিলের যেমন ব্লেড দেখেছিলেন, এখন কিন্তু হয়না তেমন। অচিরাচরিত শক্তির যোগানে যে সারি সারি উইন্ডমিল টাইপ লম্বা মিনার দেখেন সমুদ্র কিনারে, তার পাখা কিন্তু আগের মতো নয়। লম্বা, সরু, ছুঁচোলো। তাতে কী করে হাওয়া কাটে, থোড়ি আমি জানি? ঘোরেও তো খুবই আস্তে।
আমি বললুম, ধুস এখানেই ভাল। ওখানে এক ধারে একটা মোটে ফ্যান, তার আবার রাবণের মত ব্লেড ঘুরছে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে, ওতে হাওয়া কী হবে? ডক্টর কৌশিক মাইতি নিয্যস সাপোর্ট করলেন আমাকে। তিনি ফিজিওলজি পড়েছেন, ফার্মাকোলজি পড়েছেন, এয়ারোডায়নামিক্স থোড়ি পড়েছেন!
কিন্তু আমার পিঠের আরাম দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। দুটো জায়গা খালি হতেই তিনি ছুটলেন লাগেজ বগলে। ওঁর নিজের লাগেজই খুব ভারি, অবশ্য তা বিভিন্ন ধরণের লেন্সের জন্য। তার ওপর বাড়তি বোঝা অম্লানের আর নিজের ট্রাইপডগুলো, যা কোনও কাজেই আসেনি। এ ছাড়া উনি আমার লাগেজও টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, হাজার বারণেও থামবেন না। আমার একটা বাইশ ইঞ্চির ট্র্যাভেল ব্যাগ, তাতে ঠাসা গরম জামা কাপড়, যার ৬০ ভাগ কোনও কাজেই আসেনি। অথচ লোকে ভয় দেখিয়ে পাগল বানিয়ে দিয়েছিল। এই দুই ডাক্তার যে কী করেছেন আমার জন্য, তা ক্রমশ প্রকাশ্য। ফাদার ট্রীজা বললেও হয়।
তা টপকে ওদিকে গিয়ে দেখি, চেয়ার আরামপ্রদ তো বটেই, শীতল হাওয়ায় চুল উড়ছে পতাকার মতো। ডক্টর মাইতি আগেই বলেছি, ফিজিওলজি মন দিয়ে পড়েছেন, এয়ারোডায়নামিক্স কোর্সে ছিলনা। তিনি বললেন ওটা আসলে প্ল্যাটফর্মের দিক থেকে আসছে। ওদিকটা খোলা তো। পরে আমরা ট্রেনের জন্য এগিয়ে যেতে প্ল্যাটফর্মের দিকে দম আটকানো গরম পেয়েছি। আসলে ওই বিশাল ফ্যান উইথ বিশাল ছুঁচোলো ব্লেডস, খুব মন্থরগতিতে ঘোরা ফ্যানেই এই হাওয়া। ফিজিক্সটা পড়লে হতো।
ফিজিক্সটা পড়লে হতো, কিন্তু আমাকে পড়তে দেওয়া হয়নি। কাজে কাজেই কোয়ান্টাম মেকানিক্স খানিদূর পড়েই আর বুঝতে পারিনা। আমার বাপ ছিল ঘেঁচু পাবলিক। কোনও টিউশন ফিউশনের দরকার নেই, টেক্সট ভাল করে পড়লেই হয়। নিজে ইকনমিক্সের ছাত্র, ফিজিক্স কী বুঝবে। তা টিউশন-ফিউশন ছাড়াই ফিজিক্সে খুব ভাল স্কোর করলাম হায়ার সেকেন্ডারিতে। আমাদের কালে সেকেন্ডারি ছিলনা। এখন যেমন ৯৯.৭৯ নম্বর ওঠে, আমাদের কালে তা উঠত না, ৮০/৮৫ই অনেক। আমি তাই পেলাম। এক পারিবারিক বন্ধু প্রোফেসর বললেন তুমি আমার কলেজে এস। ফ্যাকাল্টি ভাল আছে, তাছাড়া আমার বন্ধুবান্ধব সব, তুমি অনেক হেল্প পাবে। এখনকার খোকাবাবু-দের জন্য বাপ মা কত দৌড়ন, আমাদের সময়ে ক্লাস নাইন হলেই ঘাড় ধরে পাখির ছানা বাসা থেকে আউট। আমি নিজেই গিয়ে ফর্ম তুলে আনলাম বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে। বাপের সই লাগে, ঘেঁচু পাবলিক বলল, এখানে পড়তে পাবেনা, এটা কো এড কলেজ।
ছুটলাম সেন্ট ক্সেভিয়ার্সে, তাঁরা বললেন ফিজিক্সে আর জায়গা নেই। কেমিস্ট্রি দিতে পারি। আমি কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম, ওটা বিষ লাগে আমার, দিন না স্যর, একটা মোটে জায়গা – তাঁরা পান খাওয়া দাঁত দেখিয়ে বললেন, ইংলিশ পড়োগে যাও। তার পর কী হইল জানে শ্যামলাল।
যদি কো এড কলেজে পড়তাম, কোনও সহপাঠিনীর সঙ্গে পেম টেমও করে ফেলতাম, সে মহিলা যদি দজ্জালও হতেন, এখনকার চেয়ে খারাপ থাকতাম কি? যাগগে বাদ্দ্যান।
তা কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমি ভাল করে বুঝতে পারিনা। আমাদের দত্তসায়েবকে বললাম স্যর একটু বুঝিয়ে দেননা। তিনি সুচিত্রা সেনের মতো হেসে বললেন, আগে ক্লাসিকাল ফিজিক্স রপ্ত করুন, তবে তো কোয়ান্টাম! ঠিকই বলেছেন। কী আর বলি।
দেখুন কোত্থেকে কোথায় চলে এল। ফ্যানের সংগে কোয়ান্টামের কী সম্পর্ক? আসলে ওই বিশাল রড দিয়ে ঝোলানো আদ্দিকালের ইন্ডিয়া ফ্যানগুলোর কথা বলছিলাম। ও ফ্যানের হাঁড়ি গুলো ছিল বেজায় ভারি। ওপরে মই দিয়ে উঠে একটা মিস্তিরির ক্যালি ছিলনা টেনে তোলে। ওদের ‘হেল্পার’ লাগত। তা নেতাজি সুভাষ রোডের এক বিশাল অফিসে আমি কর্মরত তখন। সে অফিসে ৩৮৩ জন কর্মী। সে কালে দুরকম ব্যবস্থাই চালু ছিল। কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিয়ে ব্রাইট ইয়াং ছেলেমেয়েরা ঢুকছে তখন। কিন্তু কয়েকটি বড় বড় অফিসে মামা/কাকা অ্যাপোও চালু ছিল। তা ছিলেন কয়েকজন ‘বড়বাবু’। তাঁদের রোয়াব ছিল দেখবার মতো। কাজ প্রায় করতেনই না তাঁরা। সায়েবি আমলের বিশাল বড় মেহগিনি কাঠের সেক্রেটারিয়েট টেবলে ইয়া পুরু কাচের নীচে লোকনাথ, সাইবাবা, দক্ষিণাকালী, সবাইকে নিয়েই মিটিমিটি হাসতেন, আর দিনে একটা দুটো কাগজে সই করতেন। সেই সব ব্রাইট ইয়াং ছেলেমেয়েরা দেখিয়ে দিত, এই যে, এই খানে একটা সই মেরে দিন তো –
তা একজন তেমন মানুষ ছিলেন আমাদের পেছনের ব্লকে। নাম তাঁর মনে নেই এখন। ক্ষিতীশবাবু হলেও হতে পারেন। তা একদিন খেয়ে দেয়ে পান চিবিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি-জহরকোট পরিহিত ক্ষিতীশবাবু চৌকাঠের বাইরে সবে একটা পা রেখেছেন, গৃহিনী আদুরি গলায় বললেন,
ওগো, কোথায় যাচ্চ?
আপিশ চললাম গো খোকার মা। আপিশ যেতে হবেনা? (ওঁদের অবশ্য দশটার অনেক পরে এলেও চলত। ‘বড়বাবু’ না?)
তা হ্যাঁগো, শোনোনা, রাধা ছিনেমায় উত্তমের বই এয়েচে গো। চলোনা দুজনে দেকে আসি ম্যাটিনীতে?
বলছ? বিধুমুখী, (থুৎনি ধরে) তোমার কতা কোনওদিন ফেলিচি, বলো তুমি?
যাঃ লোকের সামনে কী যে সব করো না? ছেলেপিলেরা দেকবে না?
তা দেকলে দেকবে, নিজের বৌকেই তো আদর কচ্চি, পরের বৌকে তো নয়!
যাঃ তুমি না –
তা ক্ষিতীশবাবু ধড়াচূড়ো পরেই ছিলেন, বৌদিও বাজুবন্ধ ফন্ধ বাগিয়ে রেডি। সেকালে এত ছিনতাই টিনতাই হতনা দিনের বেলায়। রাধা ‘ছিনেমায়’ দুখানা টু টোয়েন্টির ছিট ভর্তি হয়ে গেল।
ঠিক পৌনে বারোটা নাগাদ ক্ষীতিশবাবুর মাথার ওপরের সেই তিনমনি ওজনের ফ্যান ভেঙে পড়ল। ‘সায়েবি’ আমলের মেহগনি কাঠের ইয়া পুরু টেবল, তার ওপরে কাচ টাচ, সাইবাবা, লোকনাথবাবা, ও দক্ষিণাকালী নিয়ে সশব্দে ভেঙে চুরমার। লোকে বলল, টেবিলটা না থাকলে মেজে ভেদ করে চলের যেত ঐ ইন্ডিয়া ফ্যান। ওগুলোর ওজন ছাড়াও একটা সূচালো অগ্রভাগ থাকত নীচে।
সাইবাবা, লোকনাথ বাবা না দক্ষিণাকালী কে বাঁচালেন, তাই নিয়ে হেব্বি বিতর্ক চলল কদিন। বৌদিকে পাড়ার মনিহারি দোকানদার চার টাকার সিঁদুর ‘অজ্জিনাল’ বলে চল্লিশ টাকায় বেচতে লাগল। কিন্তু আর্থার কোয়েস্টলার বললেন, দেয়ার ইজ নাথিং কলড কো-ইন্সিডেন্স। এভ্রি থিং ইজ কন্টেইন্ড ইন কোয়ান্টাম। বৎস ‘কাকতালীয়’ বলিয়া কিছু হয়না। সবই কোয়ান্টামের খেল। বিল্লি চাহে মর গয়া, চাহে জিন্দা হো।
আমাকে ফিজিক্স পড়তে দেওয়া হয়নি। পড়লে কী হতো জানিনা, হয়ত কোয়ান্টামটা ভাল করে বুঝতাম। সহপাঠিনীর সঙ্গে পেম? কই আর হলো?
ও হ্যাঁ, দ্রৌপদী আর আর হলোনা , ভৌতিকও না। আসলে গায়ে খুব ব্যথা, জ্বরও আছে। কাল দেব, কেমন?
(চলবে)

দারুন লাগছে ৷ চলুক পানসি বেলঘোড়িয়া ৷
ReplyDelete